মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু, ক্ষেপণাস্ত্র এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে নতুন করে বড় পরিসরে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি সূত্র প্রভাবশালী গণমাধ্যম সিএনএনকে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহান্তে কিংবা যেকোনো মুহূর্তে এই হামলা শুরু হতে পারে। অন্যদিকে তেহরানও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে তারা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা চলছে, তা এই নতুন হামলার পর আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিতে টানা দুই সপ্তাহব্যাপী তীব্র বিমান হামলার ছক কষা হয়েছে। শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, তেহরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো এবং দক্ষিণ তেহরানের পিক্যাক্স পর্বতমালা সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও এই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তেহরান যদি অর্থবহ আলোচনায় না ফেরে, তবে তাদের ওপর এমন কঠোর সামরিক আঘাত হানা হবে যা তারা সহ্য করতে পারবে না। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রশাসন এই উত্তেজনা প্রশমনে পিছপা হবে না যতক্ষণ না তেহরান নমনীয় হয়।
তবে এই সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সামরিক মহলে তীব্র চাপ ও উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাতে ওয়াশিংটনের সামরিক ব্যয় এবং অস্ত্রভান্ডারের দ্রুত ক্ষয় বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট এবং থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যা পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষা চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সিএনএনের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতির প্রতি মাত্র ২৭ শতাংশ নাগরিকের সমর্থন রয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই যুদ্ধের তহবিল আটকে দিতে নতুন বিল আনার ঘোষণা দিয়েছেন, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানেও উত্তেজনা কমতির কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিরতি দিলেও ইরানি বাহিনী এবং তাদের মিত্ররা থেমে নেই। কুয়েতের উত্তরাঞ্চলে সম্প্রতি একটি ড্রোন হামলায় সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৌশলগত হরমুজ প্রণালি এবং ওমান উপকূলেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একাধিক জাহাজের গতিপথ রোধ করেছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন বা ইসরায়েলি কোনো নতুন আগ্রাসন চালানো হলে তা হবে চরম বোকামি এবং এর ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধ নিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় ফের যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 

















