বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও, বাংলাদেশ নিজে এ ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্ক—এই তিন ধরনের বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনও বেশ সীমিত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য বা কম দামে পণ্য রপ্তানি করে স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি করে, তবে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো প্রয়োগ করা যায়।
গবেষণাটি বলছে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ বিদ্যমান অনেক শুল্ক সুবিধা হারাবে। ফলে দেশীয় শিল্পকে বিদেশি পণ্যের অসম প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচাতে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আরও কার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো বিভিন্ন সময় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। ১৯৯২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত পরিচালনা করেছে।
ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিচালকের দপ্তর (ডিজিটিআর) বর্তমানে বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে রপ্তানি করা পিইটি ফিল্মের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। এছাড়া ভারত বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানিকৃত পাটপণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা সম্পন্ন করেছে। গত ২৫ জুন প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ভারত পণ্য ও উৎপাদনকারীভেদে নতুন শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া বর্তমান শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী, এসব পণ্যে প্রতি টনে শূন্য থেকে ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে।
নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত বাংলাদেশি উৎপাদনকারীদের পাটের সুতা ও টোকাইনির ক্ষেত্রে প্রতি টনে ৬৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগের ক্ষেত্রে ১২০ ডলার শুল্ক দিতে হবে। তবে যেসব উৎপাদনকারীর নাম তালিকায় নেই, তাদের ক্ষেত্রে পাটের সুতা ও টুইনের জন্য প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগের জন্য ২৮৩ ডলার শুল্ক নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলেই এই নতুন হার কার্যকর হবে।
অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি পণ্য শুল্কের মুখে পড়ছে। পাকিস্তান হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ওপর বেশির ভাগ রপ্তানিকারকের জন্য ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তুরস্ক কৃত্রিম তন্তুর সুতায় প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৮০ ডলার শুল্ক নিচ্ছে। আর্জেন্টিনা বোনা কাপড়ের গ্লাভসের ওপর ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিল পাটের বস্তা ও ব্যাগের ওপর প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১৬ ডলার শুল্ক আরোপ করে রেখেছে।
চলতি নভেম্বরে এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ন্যূনতম শুল্কমূল্যের মতো প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোও ধীরে ধীরে হারাবে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণের স্বার্থে আমদানি শুল্কের হার পর্যায়ক্রমে কমাতে হবে।
বিএফটিআইয়ের গবেষক হারুনুর রশীদ শামস জানান, বর্তমান শুল্ক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাড়তি শুল্কের ওপর নির্ভর না করে ডব্লিউটিওর নিয়ম মেনে স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশীয় শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্ক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।
শামস আরও বলেন, অন্যায্য বাণিজ্য শনাক্ত করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিটিসির বিশ্লেষণাত্মক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, পণ্যের উৎপাদন খরচ বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞ, বাণিজ্য আইনজীবী এবং আধুনিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
গবেষণায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর। বিশ্বাসযোগ্য শিল্প সংগঠনগুলো যাতে নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য নিরাপদভাবে পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বাণিজ্য সুরক্ষার তদন্ত প্রক্রিয়া আরও বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হবে।
পরিশেষে, বিএফটিআই সতর্ক করে বলেছে যে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশের শিল্পগুলোকে আরও বেশি বিদেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। ভর্তুকি পাওয়া পণ্য বা হঠাৎ আমদানি বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো রপ্তানিকারকদের সহায়তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
২০২১ সালের অক্টোবরে পর্যালোচনা শেষে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে বাংলাদেশের একটি কোম্পানিকে এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
এই শুল্ক ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর।
১৯৯২ সাল থেকে এই ব্যবস্থা চালু আছে।
সর্বশেষ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এটি পর্যালোচনা করা হয়।
বিএফটিআইয়ের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে।
প্যারা-ট্যারিফ বলতে কাস্টমস শুল্কের বাইরে আমদানির সময় নেওয়া বিভিন্ন ধরনের ফি বা করকে বোঝায়।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিগুলোও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
রিপোর্টার নাম: 
























