নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মন্তব্য করেছেন যে, দেশের বিরোধী দলগুলো নির্দিষ্ট কোন নীতি বা বিষuesর বিরোধিতা করে এবং কোনগুলোকে সমর্থন জোগায়, তা সাধারণ মানুষের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, কেবল আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে বিবৃতি প্রদান বা দায়সারা বক্তব্য দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বিরোধী দলগুলোর উচিত দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ভোটাধিকার সুরক্ষা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজেদের সুনির্দিষ্ট ও জোরালো অবস্থান তুলে ধরা। রাজধানীর শাহবাগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ ‘সমাবেশ ও গণসংগীত’ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জুলাই অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একটি স্পর্শকাতর সময় পার করছে যেখানে সাধারণ মানুষের মনে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রতি যেমন আস্থাহীনতা রয়েছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও লক্ষ্য নিয়েও জনমনে গভীর ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রায়শই বুঝতে পারে না যে রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক কার স্বার্থে কাজ করছে এবং কিসের পক্ষে বা বিপক্ষে তাদের অবস্থান।
জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা সাধারণ মানুষের কাছে এখনো অবোধ্য রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন এই রাজনৈতিক নেতা। তাঁর মতে, রাজপথ দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ ১০ জন মানুষের মধ্যে অন্তত আটজনই বলতে পারবেন না যে জুলাই সনদে প্রকৃতপক্ষে কী বলা হয়েছে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও আন্দোলনের মূল দাবি স্পষ্ট না করে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া ফলপ্রসূ হতে পারে না। দেশের মানুষ এমন একটি শান্তিময় সমাজ চায় যেখানে তাদের জীবনযাপন সহজ হবে এবং নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা নিশ্চিত হবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়ে নিজের ও দলের অবস্থান স্পষ্ট করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, ধর্মের প্রতি কোনো বিরোধ না থাকলেও শুধু ধর্মের কার্ড ব্যবহার করে কার্যকর রাজনীতি করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, জীবিকা এবং সুশাসন নিশ্চিতের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল স্বপ্ন এখনো অধরা রয়ে গেছে। রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এককভাবে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করার সুযোগ না পায়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
এ সময় বিচার বিভাগের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মান্না বলেন, গরিব ও সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ন্যায়বিচার পাওয়া। সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর কারাবন্দী রাখার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। বিচারকরা যেন কোনো রকম রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিএনপি এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনগণের প্রকৃত অধিকার অর্জিত হলে সাংবিধানিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা কেন করা হবে?
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, দখলদারি এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি উল্লেখ করেন, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে ব্যানার-পোস্টার লাগানো এবং রুম দখল নিয়ে সংঘর্ষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আত্মাকে চরমভাবে আঘাত করছে। ছাত্ররা যদি জনগণের অধিকার আদায়ের রাজপথ ছেড়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হয়, তবে এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগে বহিঃশক্তির গভীর ষড়যন্ত্র ও বড় শত্রু সহজেই রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে। তাই ছাত্রসমাজকে দেশ ও জাতির স্বার্থে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ও পরিপক্ব ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ কায়সার। পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ গণসংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হয়।
রিপোর্টার নাম: 




















