বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈরিতা এক নতুন মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপে ওয়াশিংটন কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, বিরল খনিজ পদার্থ রপ্তানিতে চীনের নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন কৃষিপণ্যের বাজার লক্ষ্য করে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছিল। তবে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহ্যিক চিত্রের আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর কাঠামোগত বাস্তবাতা, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও চীনকে টেক্কা দেওয়ার মতো শক্তিশালী ও মৌলিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার বিদ্যমান রয়েছে।
গত কয়েক বছরে চীন তাদের সীমিত অর্থনৈতিক অস্ত্রগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস। বর্তমান বিশ্বে এই খনিজগুলোর উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। বিশ্ববাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তোলন এবং ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মার্কিন উৎপাদন শিল্প খাতের একটি বড় অংশ কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে, মার্কিন সয়াবিন আমদানির ওপর বেইজিংয়ের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে এই কৌশলগত সুবিধাগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদী এবং বারবার প্রয়োগের ফলে এর কার্যকারিতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।
এর বিপরীতে, ওয়াশিংটনের রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং কাঠামোগত অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব। উচ্চপ্রযুক্তির খাত বা হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রির জটিল অংশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র একক আধিপত্য বজায় রেখেছে। বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তি খাতের আয়ের সিংহভাগই মার্কিন কোম্পানিগুলোর পকেটে যায়, যেখানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ অত্যন্ত নগণ্য। এছাড়া, চীন তার বিশাল রপ্তানিভিত্তিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্যের জোগান নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। গবেষকদের মতে, ওয়াশিংটন যদি একা লড়াই না করে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা চীনের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।
এই লক্ষ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ জোটের মতো উদ্যোগগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করতে এবং কৌশলগত খনিজ ও উন্নত উৎপাদনে চীনের প্রভাব কমাতে কাজ শুরু করেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু ভুল কূটনৈতিক পদক্ষেপ, যেমন মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, এই সম্মিলিত শক্তি ব্যবহারে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করেছিল, তবুও ওয়াশিংটন চাইলে মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। বর্তমান বিশ্ববাণিজ্যের এই জটিল সমীকরণে মার্কিন নেতৃত্ব কীভাবে তাদের এই অব্যবহৃত অর্থনৈতিক শক্তি কাজে লাগায়, সেটাই আগামী দিনের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।
রিপোর্টার নাম: 
























