আফ্রিকার কেনিয়ার তুর্কানা হ্রদের তীরে আবিষ্কৃত প্রাচীন পায়ের ছাপ মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এক নতুন ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের উন্মোচন করেছে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গেছে, আজ থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগেও আদিম মানবসমাজে পুরুষ ও নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং চলাফেরার ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ (পিএনএএস)-এ প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল প্রাচীন মানুষের আচরণ ও বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১৪ লাখ ৩০ হাজার বছর আগে ‘প্যারানথ্রোপাস বইসেই’ প্রজাতির আটজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কেনিয়ার একটি নদীর তীরের কাদামাটির ওপর দিয়ে একসঙ্গে হেঁটে গিয়েছিল। ওই নির্দিষ্ট যাত্রায় কোনো নারী বা শিশুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। এ বিষয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও অধ্যয়নটির অন্যতম লেখক নিল রোচ জানিয়েছেন, এই সুনির্দিষ্ট পুরুষতান্ত্রিক দলবদ্ধ চলাচল ইঙ্গিত করে যে, সেই সুদূর অতীতেও পুরুষেরা নিজস্ব বলয় তৈরি করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। বর্তমান যুগের শিম্পাঞ্জি বা গরিলাদের মতো এই আদিম মানুষেরাও হয়তো নিজস্ব এলাকা রক্ষা করা বা দলবদ্ধভাবে শিকারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এমন যৌথ অভিযাত্রায় অংশ নিত।
প্যারানথ্রোপাস বইসেই প্রজাতিটি আধুনিক মানুষেরই একটি প্রাচীন ও বিলুপ্ত আত্মীয়। দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে এই প্রজাতিটি শারীরিকভাবে বেশ খাটো ও ছোট আকৃতির হতো, কারণ এতদিন কেবল তাদের খুলি ও দাঁতের কিছু জীবাশ্মই পাওয়া গিয়েছিল। তবে বর্তমানের উন্নত দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পায়ের ছাপগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করার পর গবেষকরা এক বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। জানা গেছে, ওই প্রজাতিটির শারীরিক গঠন ছিল বেশ শক্তিশালী এবং তাদের গড় উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় ফুট ও ওজন প্রায় ৭৫ কেজি। বিশিষ্ট গবেষক কেভিন হাটালের মতে, উচ্চতা ও শক্তির বিচারে তারা সেসময়ের প্রভাবশালী অপর প্রাচীন মানব প্রজাতি ‘হোমো ইরেকটাস’-এর সমকক্ষ ছিল।
আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক আগে বিখ্যাত বিজ্ঞানী কে বেরেনসমেয়ার কেনিয়ার তুর্কানা হ্রদ অঞ্চলটিতে প্রথম এই ঐতিহাসিক পায়ের ছাপগুলো খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে তৎকালীন প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং ছাপগুলো সংরক্ষণের তাগিদে সেগুলো দীর্ঘকাল বালুর নিচে ঢেকে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি আধুনিক ভূ-কালনির্ণয় পদ্ধতি ও আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের স্তর পরীক্ষা করে এই ছাপগুলোর সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, মানব বিবর্তনের আদিম পর্যায় থেকেই সমাজে লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন এবং উন্নত সামাজিক চেতনার বীজ রোপিত হয়েছিল।
রিপোর্টার নাম: 






















