Hi

০১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জে শতবর্ষী সরকারি পুকুর দখল ও দূষণ: বিপন্ন কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য, সংস্কারের দাবি জোরালো

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ঐতিহাসিক শতবর্ষী সরকারি পুকুরটি আজ চরম অবহেলা, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার। এককালের জনকল্যাণমুখী এই জলাধারটি বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং এর প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকাই অবৈধ জবরদখলকারীদের কবজায় চলে গেছে। এই পরিস্থিতি কেবল একটি প্রাকৃতিক উৎসের ধ্বংস নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতার এক স্পষ্ট প্রমাণ। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এ ধরনের জনসম্পদের অবমূল্যায়ন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের চরম ঘাটতিকেই ফুটিয়ে তোলে।

পুকুরটির এই চরম করুণ দশার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। বিদ্যালয় ভবনটির ঠিক পাশেই এই জলাধারটি অবস্থিত থাকায় প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীকে তীব্র দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ এবং বিভিন্ন রোগজীবাণুর ঝুঁকির মধ্যে সময় কাটাতে হয়। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর আশেপাশের পরিবেশ নির্মল, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হওয়ার কথা। জলাধারের পচা পানি ও জমে থাকা আবর্জনা থেকে ছড়ানো দূষিত বাতাস শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। অভিভাবক মহলেও এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে, কারণ সামান্য সচেতনতার অভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অতীতে একাধিকবার এই অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কেবল লোক দেখানো বা সাময়িক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ ছিল। নিয়মিত তদারকি, আইনি পদক্ষেপ এবং রক্ষণাবেক্ষণের টেকসই ব্যবস্থার অভাবে উচ্ছেদকৃত অংশগুলো আবারও দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার অভাবের কারণেই জনস্বার্থের এই ইস্যুগুলো বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে পুকুরটির সম্পূর্ণ অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে এবং এই প্রক্রিয়াকে কেবল এককালীন অভিযানে সীমিত না রেখে স্থায়ী তদারকির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে জলাধারটির পূর্ণাঙ্গ খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরু করতে হবে যাতে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও রূপ ফিরে আসে। তৃতীয়ত, পুকুরের চারপাশ ঘিরে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ বর্জ্য ফেলতে বা নতুন করে দখল করতে না পারে। চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর যৌথ অংশগ্রহণে একটি বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করবে। একই সাথে বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পৃথক ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই শতবর্ষী পুকুরটি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যও মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

জনপ্রিয়

ক্রিকেট ইতিহাসের মহানায়ক স্যার গ্যারি সোবার্স এবং স্মৃতির আয়নায় সোনালী সেই দিনগুলো

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সুনামগঞ্জে শতবর্ষী সরকারি পুকুর দখল ও দূষণ: বিপন্ন কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য, সংস্কারের দাবি জোরালো

আপডেট : ০৯:২৩:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ঐতিহাসিক শতবর্ষী সরকারি পুকুরটি আজ চরম অবহেলা, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার। এককালের জনকল্যাণমুখী এই জলাধারটি বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং এর প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকাই অবৈধ জবরদখলকারীদের কবজায় চলে গেছে। এই পরিস্থিতি কেবল একটি প্রাকৃতিক উৎসের ধ্বংস নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতার এক স্পষ্ট প্রমাণ। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এ ধরনের জনসম্পদের অবমূল্যায়ন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের চরম ঘাটতিকেই ফুটিয়ে তোলে।

পুকুরটির এই চরম করুণ দশার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। বিদ্যালয় ভবনটির ঠিক পাশেই এই জলাধারটি অবস্থিত থাকায় প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীকে তীব্র দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ এবং বিভিন্ন রোগজীবাণুর ঝুঁকির মধ্যে সময় কাটাতে হয়। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর আশেপাশের পরিবেশ নির্মল, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হওয়ার কথা। জলাধারের পচা পানি ও জমে থাকা আবর্জনা থেকে ছড়ানো দূষিত বাতাস শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। অভিভাবক মহলেও এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে, কারণ সামান্য সচেতনতার অভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অতীতে একাধিকবার এই অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কেবল লোক দেখানো বা সাময়িক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ ছিল। নিয়মিত তদারকি, আইনি পদক্ষেপ এবং রক্ষণাবেক্ষণের টেকসই ব্যবস্থার অভাবে উচ্ছেদকৃত অংশগুলো আবারও দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার অভাবের কারণেই জনস্বার্থের এই ইস্যুগুলো বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে পুকুরটির সম্পূর্ণ অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে এবং এই প্রক্রিয়াকে কেবল এককালীন অভিযানে সীমিত না রেখে স্থায়ী তদারকির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে জলাধারটির পূর্ণাঙ্গ খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরু করতে হবে যাতে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও রূপ ফিরে আসে। তৃতীয়ত, পুকুরের চারপাশ ঘিরে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ বর্জ্য ফেলতে বা নতুন করে দখল করতে না পারে। চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর যৌথ অংশগ্রহণে একটি বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করবে। একই সাথে বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পৃথক ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই শতবর্ষী পুকুরটি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যও মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।