কথা সাহিত্যিক ও লেখক রেজাউর রহমানের বিখ্যাত গল্প ‘কেনাবেচার হাট’ প্রথম আলোর ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৫ মার্চ। দীর্ঘ সরকারি চাকুরিজীবনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা, দেশের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিত্যদিনের যোগাযোগ এবং বিচিত্র মানুষের ভিড় ঠেলে এক অদ্ভুত চরিত্রের মুখোমুখি হওয়ার এক অনবদ্য সাহিত্যিক বয়ান এই গল্পটি। চাকরির শেষ প্রান্তে এসে ঢাকা হেড অফিসে যোগদানের পর লেখক আশা করেছিলেন কিছুটা ফুরসত মিলবে, কিন্তু সেখানে শারীরিক জনস্রোতের বদলে শুরু হয় টেলিফোন, ফ্যাক্স, ইমেইল এবং ওপর মহলের তদ্বিরের অন্তহীন চাপ।
দুপুরের বিরতির সময় হঠাৎ ইন্টারকমের মাধ্যমে অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে এক অদ্ভুত ফোন আসে। হরপ্রসাদ ভৌমিক নামের এক ব্যক্তি লাইব্রেরির জন্য একটি সেবামূলক আবেদন নিয়ে দেখা করতে চান। শুরুতে বিরক্ত হলেও কৌতূহলবশত তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দেন কর্মকর্তা। অত্যন্ত পরিপাটি এবং বিনম্রি ভঙ্গির হরপ্রসাদ ভৌমিকের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রকাশ পায় তার আসল পরিচয়। তিনি মূলত এফডিসির সিনেমার একজন ক্যারেক্টার আর্টিস্ট বা চরিত্রাভিনেতা, যিনি কখনো বিদেশি নাগরিক, কখনো আইনজীবী আবার কখনো হোটেল ম্যানেজারের চরিত্রে অভিনয় করেন। অভিনব এই পেশার কথা শোনার পর লেখকের মনে এক ধরণের কৌতূহল ও বিস্ময়ের জন্ম নেয়।
তবে আলোচনার মূল মোড় পরিবর্তন হয় যখন হরপ্রসাদ ভৌমিক তার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তিনি তার প্রয়াত পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিজ এলাকায় ‘গঙ্গাপ্রসাদ পাবলিক লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে বইপত্র সংগ্রহের জন্য আবেদন নিয়ে এসেছেন। হরপ্রসাদের এই মহৎ উদ্যোগ এবং পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ লেখকের মনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিজের প্রয়াত বাবা ও গ্রামের অসহায় মায়ের কথা স্মরণ করে লেখকের মন বেদনাসিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি অনুভব করেন, ব্যস্ত ও যান্ত্রিক পেশাগত জীবনের ভিড়ে হরপ্রসাদ এক অনন্য মানবকল্যাণমূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
গল্পটির শেষাংশে মানবজীবনের গভীর সত্য উন্মোচিত হয়। হরপ্রসাদ কেবল নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য নয়, বরং মানুষের মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বাণিজ্য ও লেনদেনের যান্ত্রিক সরকারি দপ্তরে বসেও বই এবং জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখক এক গভীর উপলব্ধিতে পৌঁছান। ‘কেনাবেচার হাট’ কেবল একটি দাপ্তরিক বা পেশাগত জীবনের চিত্র নয়, এটি মানুষের আত্মিক সম্পর্ক, স্মৃতিচারণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অসামান্য সাহিত্যিক দলিল হিসেবে পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 























