দেশে আবারও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং, কোথাও গ্যাসের চাপ কম, আবার কোথাও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ফলে নাগরিকের ভোগান্তি হলে সরকারের জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে। তবে একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা জরুরি বর্তমান সংকটের প্রকৃত কারণ কী? কারণ কোনো একটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা সরকারের ওপর পুরো সংকটের দায় চাপিয়ে দিলেই বাস্তবতা বোঝা যায় না। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক তাৎক্ষণিক, আন্তর্জাতিক ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কারণ।
একটি LNG টার্মিনালের বিপর্যয়, বড় ধাক্কা জাতীয় ব্যবস্থায় : বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের অন্যতম তাৎক্ষণিক কারণ মহেশখালীর একটি LNG টার্মিনালে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়া। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থায় যেখানে আগে থেকেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে, সেখানে একসঙ্গে কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু আবাসিক গ্রাহকের চুলায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও একই গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গিয়ে আঘাত করে।
সরল হিসাবটি তাই এমন—গ্যাস সরবরাহ কমেছে → গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে → জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়েছে → লোডশেডিং বেড়েছে। তবে এটিকে সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যাবে না। এর সঙ্গে কয়লা, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সক্ষমতা, আর্থিক সংকট ও আমদানিনির্ভরতার বিষয়ও জড়িত।
একটি দুর্ঘটনা পুরো সংকটের ব্যাখ্যা নয়- এখানে অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—মহেশখালীর টার্মিনালে কীভাবে আগুন বা কারিগরি ত্রুটি হলো? যদি তদন্তে অবহেলা, নিরাপত্তা ত্রুটি বা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। LNG টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। তবে তদন্তের আগে এটিকে নাশকতা বা কোনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও সমানভাবে সমস্যাজনক। এমন দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় দিক: কয়লা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও জাতীয় গ্রিডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামের পাশে ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট লেখা থাকলেই যে কেন্দ্রটি সবসময় সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, এমন ধারণা ভুল। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু generating capacity থাকলেই হয় না। প্রয়োজন জ্বালানি, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তাই কোনো কেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেলে তার পেছনে জ্বালানি সরবরাহ, কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই—কেন?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে ভুলটি হয়, তা হলো installed capacity-কে actual generation-এর সঙ্গে এক করে দেখা। কোনো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াট হলেই প্রতিদিন ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে—এমন নয়। কোনো কেন্দ্র জ্বালানি না পেলে বন্ধ থাকতে পারে। কোনো কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকতে পারে। কোনো কেন্দ্রের যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি হতে পারে। আবার কোনো সময় উৎপাদন করলেও transmission বা distribution ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই বিদ্যুৎ পুরোপুরি ব্যবহার করা নাও যেতে পারে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘ক্ষমতা কত?’ নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—প্রয়োজনের সময় কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে উৎপাদন করা যাচ্ছে?
আর্থিক সংকটও জ্বালানি সংকটকে বাড়িয়ে দেয়
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিপুল বকেয়া। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর—বিদ্যুৎ আমদানিসহ—মোট বকেয়া বিল ছিল প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এটি শুধু কুইক-রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর বকেয়া নয়। এর মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি তেল, কয়লা এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনার বিষয় রয়েছে। এই আর্থিক চাপ গুরুতর। কারণ বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধে সমস্যা হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার চাপও যুক্ত হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট শুধু প্রযুক্তিগত সংকট নয়; এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটও।
আদানি ও ভারতীয় বিদ্যুৎ: বিতর্ক আছে, কিন্তু তথ্যও প্রয়োজন
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং বিশেষ করে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। চুক্তির মূল্য, শর্ত, আমদানিনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থে চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হবে কি না—এটি একটি বৈধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক। কিন্তু এখানেও একটি সীমারেখা থাকা দরকার। ভারত রাজনৈতিক চাপ দিচ্ছে—এমন অভিযোগ যদি করা হয়, তাহলে তার প্রমাণও দেখাতে হবে। একইভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রতিটি ঘটনাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব কারণগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে। সমালোচনা করতে হলে তথ্যের ভিত্তিতে করাই সবচেয়ে কার্যকর।
তাহলে কি সরকারের কোনো দায় নেই?
অবশ্যই আছে। একটি LNG টার্মিনালে দুর্ঘটনা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, জ্বালানি ব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব, যাতে একটি টার্মিনালের সমস্যায় পুরো দেশ বড় সংকটে না পড়ে। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি হতেই পারে। কিন্তু preventive maintenance যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সেটিও সরকারের নজরদারির বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম বাড়তেই পারে। কিন্তু আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার। অতএব, ‘সরকারের হাতে নেই’ বলে সব দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার ‘সবকিছুর জন্য সরকার দায়ী’ বলেও বাস্তব সমস্যার সমাধান হবে না।
বাংলাদেশের আসল দুর্বলতা কোথায়?
সম্ভবত উত্তরটি লুকিয়ে আছে জ্বালানি উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যের অভাবে। একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত LNG অবকাঠামো, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, দুর্বল supply chain এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের energy security যথেষ্ট resilient নয়। গ্যাসের সমস্যা হলে বিদ্যুৎ কমে। কয়লার সরবরাহে সমস্যা হলে বিদ্যুৎ কমে। LNG টার্মিনাল বন্ধ হলে গ্যাস কমে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা হলে আমদানি ব্যয় বাড়ে। অর্থাৎ এক জায়গার সমস্যা অন্য জায়গায় গিয়ে আঘাত করে। এটি কোনো এক সরকারের তৈরি সমস্যা নয়। এটি বহু বছরের নীতি, বিনিয়োগ, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ফল।
দোষারোপের চেয়ে এখন প্রয়োজন বড় প্রশ্ন -বর্তমান লোডশেডিং নিয়ে সরকারের সমালোচনা অবশ্যই হবে। নাগরিকের দুর্ভোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক যেন এমন জায়গায় না যায়, যেখানে একটি LNG টার্মিনালের দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে সমুদ্রের আবহাওয়া, কয়লার সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার—সবকিছুর দায় এক ব্যক্তি বা একটি দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আবার এসব ঘটনার কারণে সরকার সম্পূর্ণ দায়মুক্ত—এমন দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের দায়িত্ব হলো সংকট সামলানো, দ্রুত মেরামত করা, বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করা, supply chain শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা তৈরি করা।
অন্ধকার থেকে বের হওয়ার পথ -লোডশেডিং কমাতে সাময়িকভাবে LNG টার্মিনাল মেরামত, কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আরও বড়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। LNG অবকাঠামোয় redundancy তৈরি করতে হবে। কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির strategic reserve বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের preventive maintenance শক্তিশালী করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেও টেকসই করতে হবে। কারণ একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলেই পুরো দেশ অন্ধকারে চলে যাবে না।
শেষ কথা- মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ নেই—এটি কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব কষ্ট। তাই সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইতেই হবে। কিন্তু জবাবদিহি আর রাজনৈতিক দোষারোপ এক জিনিস নয়। আজকের সংকটের কিছু কারণ সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিছু কারণ বহু বছরের উত্তরাধিকার। আবার কিছু কারণ বর্তমান ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখাই দায়িত্বশীল নাগরিক ও সাংবাদিকতার কাজ। সরকারের ভুলের সমালোচনা হোক। কিন্তু যে সমস্যার কারণ প্রাকৃতিক, আন্তর্জাতিক বা কাঠামোগত—সেটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বানিয়ে ফেললে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না স্লোগানে। উৎপাদন হয় গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি, অর্থ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সঠিক পরিকল্পনায়। বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী কে?’ হওয়া উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— ‘কেন আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা এত সহজে একটি ধাক্কায় নড়বড়ে হয়ে যায়—এবং কীভাবে সেটিকে ভবিষ্যতের জন্য আরও নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় করা যায়?’ এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
মোঃ জাকারিয়া হোসেন 
























