Hi

০৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড: দার্শনিক সত্য নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার?

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালের এথেন্সের আদালতকক্ষে সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মৃত্যুদণ্ড পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। দার্শনিক সক্রেটিসের বিচার কেবল একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন এথেন্সের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক চরম পরিণতি। পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে স্পার্টার কাছে এথেন্সের পরাজয়ের পর সেখানে যে ‘ত্রিশ স্বৈরশাসক’ বা থার্টি টাইরান্টসের অলিগার্কিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা শহরটিকে রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই স্বৈরশাসকদের পতন এবং পুনরায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এথেন্সের সমাজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। গণতন্ত্রপন্থীরা প্রতিশোধের নেশায় মত্ত থাকলেও ‘সাধারণ ক্ষমা’ বা অ্যামনেস্টির কারণে সরাসরি রাজনৈতিক বিচার করতে পারছিল না। এই আইনি শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই সক্রেটিসকে বলি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল তিনটি—রাষ্ট্রীয় দেবতাদের অস্বীকার করা, নতুন দেবতার প্রবর্তন এবং যুবকদের বিপথগামী করা। তবে এই অভিযোগগুলোর নেপথ্যে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সক্রেটিসের ছাত্র হিসেবে পরিচিত ক্রিটিয়াস এবং অ্যালসিবায়াদেসের কর্মকাণ্ড এথেন্সের জনগণের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। যদিও সক্রেটিস ব্যক্তিগতভাবে গণতন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, কিন্তু তিনি অলিগার্কি বা স্বৈরতন্ত্রের দোসর ছিলেন—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ ইতিহাসে নেই। বরং তিনি স্বৈরশাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন এবং আইন মান্য করার নজির স্থাপন করেছিলেন। অভিযোগকারীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ধর্মীয় ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছিল।

বিচার চলাকালীন সক্রেটিসের আপসহীন ও দম্ভপূর্ণ আচরণ বিচারকদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মাত্র ৫৯ ভোটের ব্যবধানে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর কারাগারে থাকাকালীন পালানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। প্লেটোর বর্ণনায়, তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের নৈতিক চুক্তির প্রতি অটল থেকে হেমলকের পাত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। সক্রেটিসের এই মৃত্যু কেবল একটি দার্শনিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে রাজনৈতিক কৌশল ও প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। আজও সক্রেটিসের বিচার ইতিহাসের পাতায় সেই রাজনৈতিক খেলার দর্পণ হয়ে আছে, যেখানে ক্ষমতার স্বার্থে ন্যায়বিচারকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।

জনপ্রিয়

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে এনএসইউর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য কুইজ চ্যালেঞ্জ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড: দার্শনিক সত্য নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার?

আপডেট : ০১:৪৪:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালের এথেন্সের আদালতকক্ষে সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মৃত্যুদণ্ড পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। দার্শনিক সক্রেটিসের বিচার কেবল একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন এথেন্সের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক চরম পরিণতি। পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে স্পার্টার কাছে এথেন্সের পরাজয়ের পর সেখানে যে ‘ত্রিশ স্বৈরশাসক’ বা থার্টি টাইরান্টসের অলিগার্কিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা শহরটিকে রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই স্বৈরশাসকদের পতন এবং পুনরায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এথেন্সের সমাজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। গণতন্ত্রপন্থীরা প্রতিশোধের নেশায় মত্ত থাকলেও ‘সাধারণ ক্ষমা’ বা অ্যামনেস্টির কারণে সরাসরি রাজনৈতিক বিচার করতে পারছিল না। এই আইনি শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই সক্রেটিসকে বলি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল তিনটি—রাষ্ট্রীয় দেবতাদের অস্বীকার করা, নতুন দেবতার প্রবর্তন এবং যুবকদের বিপথগামী করা। তবে এই অভিযোগগুলোর নেপথ্যে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সক্রেটিসের ছাত্র হিসেবে পরিচিত ক্রিটিয়াস এবং অ্যালসিবায়াদেসের কর্মকাণ্ড এথেন্সের জনগণের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। যদিও সক্রেটিস ব্যক্তিগতভাবে গণতন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, কিন্তু তিনি অলিগার্কি বা স্বৈরতন্ত্রের দোসর ছিলেন—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ ইতিহাসে নেই। বরং তিনি স্বৈরশাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন এবং আইন মান্য করার নজির স্থাপন করেছিলেন। অভিযোগকারীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ধর্মীয় ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছিল।

বিচার চলাকালীন সক্রেটিসের আপসহীন ও দম্ভপূর্ণ আচরণ বিচারকদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মাত্র ৫৯ ভোটের ব্যবধানে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর কারাগারে থাকাকালীন পালানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। প্লেটোর বর্ণনায়, তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের নৈতিক চুক্তির প্রতি অটল থেকে হেমলকের পাত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। সক্রেটিসের এই মৃত্যু কেবল একটি দার্শনিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে রাজনৈতিক কৌশল ও প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। আজও সক্রেটিসের বিচার ইতিহাসের পাতায় সেই রাজনৈতিক খেলার দর্পণ হয়ে আছে, যেখানে ক্ষমতার স্বার্থে ন্যায়বিচারকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।