কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত হোটেল শিখা ইন-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের দ্রুত কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একই ঠিকানার চারজন রয়েছেন। এছাড়া ঢাকার সাভারের আহমেদ বাবু নামে একজন নিহত হয়েছেন। ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার বাসিন্দা সন্দীপ পাসওয়ানেরও পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ছয়জনের বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো: ১. শর্ণশিষ দত্ত, জন্ম: ২০ ডিসেম্বর ২০২৩, পিতা: দেবাশিস দত্ত, ঠিকানা: আরুয়াপাড়া, ১৯/১, বাহাদুর আলী বিশ্বাস, কুষ্টিয়া মডেল, মোহিনী মিল, কুষ্টিয়া। ২. আফসানা শিম্মিন, জন্ম: ৬ জানুয়ারি ১৯৯৯, পিতা: মো. আকরাম আলী, ঠিকানা: আরুয়াপাড়া, ১৯/১, বাহাদুর আলী বিশ্বাস, কুষ্টিয়া মডেল, মোহিনী মিল, কুষ্টিয়া। ৩. দেবাশিস দত্ত, জন্ম: ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭, পিতা: দিলীপ কুমার দত্ত, ঠিকানা: আরুয়াপাড়া, ১৯/১, বাহাদুর আলী বিশ্বাস, কুষ্টিয়া মডেল, মোহিনী মিল, কুষ্টিয়া। ৪. মো. আকরাম আলী, জন্ম: ১৬ জুন ১৯৬২, পিতা: ইয়াসিন আলী, ঠিকানা: থানাপাড়া, ৪, মনহুম বদরুদ্দোজা রোড, কুষ্টিয়া মডেল, কুষ্টিয়া হেড পোস্ট অফিস, কুষ্টিয়া। ৫. আহমেদ বাবু, জন্ম: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, পিতা: আদম আলী, ঠিকানা: বেগুনবাড়ি, সাভার, আমিনবাজার, ঢাকা–১৩৪৮। ৬. সন্দীপ পাসওয়ান, বয়স: ১৯ বছর, পিতা: প্রয়াত পাসওয়ান ভুবনেশ্বর, ঠিকানা: গ্রাম পিলমউ, পোস্ট খারিওডিহ, থানা হেরোডিহ, জেলা গিরিডি, ঝাড়খণ্ড–৮১৫৩১৪।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত প্রায় ২টার দিকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন যখন লাগে, হোটেলের অতিথিরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হোটেলের ঘরগুলো ধোঁয়ায় ভরে গেলে আতঙ্কিত অতিথিরা বাঁচার জন্য ছুটাছুটি শুরু করেন। হোটেলের কাছেই কলকাতার ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর থাকায় চারটি গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। নিউ মার্কেট থানা পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় বাইরে থেকে আগুনের শিখা দেখা না গেলেও গলগল করে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছিল।
ভবনটির পথ অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবন থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করেন। তাদের অনেকেই ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, মৃতদের শরীরে পোড়া চিহ্ন তেমন না থাকলেও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর আসল কারণ স্পষ্ট হবে। এ ঘটনায় আহতদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
হোটেলের এক অতিথি জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হোটেল ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ধোঁয়ায় পথ অনুমান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ টয়লেটে ঢুকে পড়েন, আবার কেউ জানলা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। ওই অতিথি বলেন, “দমকলকর্মীরা না এলে আমরাও হয়ত বাঁচতে পারতাম না।” ভবনের চতুর্থ তলার আরেক অতিথি ইজাজ আহমেদ জানান, রাত সোয়া ২টার দিকে দুই নারীর আর্তনাদ শুনে তাদের ঘুম ভাঙে। তারা দরজা খুলতেই ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। ইজাজ বলেন, “ঘর থেকে বেরিয়ে যে বারান্দা, তা খুব সরু। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল সেটা।”
ভবনের উপরের তলায় থাকা এক পরিবারকে উদ্ধার করা হয়েছে। ওই পরিবারের এক নারী অভিযোগ করেন, হোটেলগুলোকে বারবার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা লাগাতে বলা হলেও কেউ নিয়ম মানেনি। তিনি বলেন, “প্রশাসনকে অভিযোগ জানিয়েও লাভ হয়নি।” অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে দুই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। আনন্দবাজারের মতে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে, আবার এনডিটিভি লিখেছে, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হোটেল বা তার আশপাশের হোটেলগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে পুলিশের সন্দেহ রয়েছে। ইতোমধ্যে হোটেল এবং আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। কলকাতার বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক অভিযোগ করেছেন, হোটেলগুলো বিধি মেনে তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, “এগুলো মূলত আবাসিক ভবন ছিল। সেটাকে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।” হোটেলের ঘরের সংখ্যা বাড়াতে পিলার কেটে জায়গা বাড়ানোয় ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
যে নয়জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, তাদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী এবং একজন শিশু। অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনটিতে ঠিক কতজন ছিলেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশি এসব হোটেলে অবস্থান করেন। উদ্ধারকাজ শেষে ভবনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে এবং ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
ঘটনার পর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরু গলির মধ্যে বাণিজ্যিক হোটেল পরিচালনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ আইন লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন নিহত বাংলাদেশিদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছে এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 
























