Hi

০৩:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ড্রোনযোগে অবিশ্বাস্য উদ্ধার: আট মাস গর্তে বন্দি সেনার গল্প

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০২:২৬:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ১০ জন দেখেছে

ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো যুদ্ধের ময়দানে এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধারে যাওয়া আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত।

ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি আট মাসেরও বেশি সময় ধরে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের বয়লারের নিচে ছোট্ট গর্তে বন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। ছোট্ট একটি মাটির বাংকারে তাদের থাকতে হতো। প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’।

চারদিকে রাশিয়ার ড্রোন টহলের কারণে উদ্ধারের কোনো সুযোগ না থাকায় বেঁচে থাকার আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’। তার ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’। ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো।

কিন্তু গত ৪ অক্টোবর বিশাল এক মালবাহী ড্রোনের সহায়তায় তাকে আকাশপথে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে কোনো সেনাকে উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম। খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভ্লাসেনকো জানান, গত বছরের মে মাসে তিনি খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সাথে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনা।

যুদ্ধে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ভ্লাসেনকো ও তার সঙ্গী ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের নিচে আশ্রয় নেন।

এরপর সেখানে রাশিয়ার একটি ড্রোন হামলা চালালে বাসকি নিহত হন এবং ভ্লাসেনকো গুরুতর আহত হন। সেখানে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হলে তাদের শনাক্ত করে রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও মারাত্মক আঘাত লাগে। ধীরে ধীরে তার বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে।

একপর্যায়ে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এবং চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় ভ্লাসেনকো নিজেই ছুরি ব্যবহার করে তার ডান পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলতে বাধ্য হন। ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে গেছে, অন্য পাটিও বাঁচাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছেন। তার দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো।

সেই স্কুলের ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আয়তনের গর্তে তিনি টানা আট মাস প্রতিকূল অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। ইউক্রেনীয় বাহিনী একাধিকবার ছোট যান পাঠিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও রুশ ড্রোন হামলার কারণে ব্যর্থ হয়। এলাকাটি পরিচিত ছিল ‘কিল জোন’ হিসেবে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করতে সক্ষম। ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে তার মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন। ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান ব্যবহার করেও উদ্ধার অভিযান চালানোর চেষ্টা করেন। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

অক্টোবরের শুরুতে ড্রোনের মাধ্যমে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং নির্দেশনাসহ ফোন পৌঁছানো হয়। অভিযানের দিন চারটি ছোট ড্রোন ও কামানের সাহায্যে আকাশপথ নিরাপদ করা হয় যাতে উদ্ধারকারী ড্রোনটি বাধা না পায়। ভ্লাসেনকোকে ক্যারাবিনারের মাধ্যমে হারনেসের সাথে আটকে ৭০ মিটার উপরে তুলে ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই আকাশপথের যাত্রায় প্রায় ১৫ মিনিট সময় লেগেছিল। মাটি থেকে ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

ভ্লাসেনকো জানান, আকাশপথে ঝুলে থাকা অবস্থায় তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া, কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। বনের মধ্যে পড়ার ভয় তার ছিল না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তার এই লোমহর্ষক বর্ণনা ইউক্রেনীয় বাহিনীর উদ্ধার অভিযানের ভিডিও ফুটেজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের এই সেনার জন্য এই উদ্ধার ছিল নতুন জীবনের মতো।

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

ড্রোনযোগে অবিশ্বাস্য উদ্ধার: আট মাস গর্তে বন্দি সেনার গল্প

আপডেট : ০২:২৬:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো যুদ্ধের ময়দানে এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধারে যাওয়া আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত।

ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি আট মাসেরও বেশি সময় ধরে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের বয়লারের নিচে ছোট্ট গর্তে বন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। ছোট্ট একটি মাটির বাংকারে তাদের থাকতে হতো। প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’।

চারদিকে রাশিয়ার ড্রোন টহলের কারণে উদ্ধারের কোনো সুযোগ না থাকায় বেঁচে থাকার আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’। তার ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’। ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো।

কিন্তু গত ৪ অক্টোবর বিশাল এক মালবাহী ড্রোনের সহায়তায় তাকে আকাশপথে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে কোনো সেনাকে উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম। খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভ্লাসেনকো জানান, গত বছরের মে মাসে তিনি খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সাথে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনা।

যুদ্ধে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ভ্লাসেনকো ও তার সঙ্গী ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের নিচে আশ্রয় নেন।

এরপর সেখানে রাশিয়ার একটি ড্রোন হামলা চালালে বাসকি নিহত হন এবং ভ্লাসেনকো গুরুতর আহত হন। সেখানে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হলে তাদের শনাক্ত করে রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও মারাত্মক আঘাত লাগে। ধীরে ধীরে তার বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে।

একপর্যায়ে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এবং চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় ভ্লাসেনকো নিজেই ছুরি ব্যবহার করে তার ডান পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলতে বাধ্য হন। ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে গেছে, অন্য পাটিও বাঁচাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছেন। তার দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো।

সেই স্কুলের ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আয়তনের গর্তে তিনি টানা আট মাস প্রতিকূল অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। ইউক্রেনীয় বাহিনী একাধিকবার ছোট যান পাঠিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও রুশ ড্রোন হামলার কারণে ব্যর্থ হয়। এলাকাটি পরিচিত ছিল ‘কিল জোন’ হিসেবে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করতে সক্ষম। ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে তার মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন। ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান ব্যবহার করেও উদ্ধার অভিযান চালানোর চেষ্টা করেন। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

অক্টোবরের শুরুতে ড্রোনের মাধ্যমে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং নির্দেশনাসহ ফোন পৌঁছানো হয়। অভিযানের দিন চারটি ছোট ড্রোন ও কামানের সাহায্যে আকাশপথ নিরাপদ করা হয় যাতে উদ্ধারকারী ড্রোনটি বাধা না পায়। ভ্লাসেনকোকে ক্যারাবিনারের মাধ্যমে হারনেসের সাথে আটকে ৭০ মিটার উপরে তুলে ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই আকাশপথের যাত্রায় প্রায় ১৫ মিনিট সময় লেগেছিল। মাটি থেকে ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

ভ্লাসেনকো জানান, আকাশপথে ঝুলে থাকা অবস্থায় তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া, কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। বনের মধ্যে পড়ার ভয় তার ছিল না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তার এই লোমহর্ষক বর্ণনা ইউক্রেনীয় বাহিনীর উদ্ধার অভিযানের ভিডিও ফুটেজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের এই সেনার জন্য এই উদ্ধার ছিল নতুন জীবনের মতো।