ভেনেজুয়েলায় অবাধ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। প্রায় দুই বছর পর প্রথমবারের মতো দেশটির বিভিন্ন শহরে বিরোধীদের এমন বড় ধরনের কর্মসূচি পালিত হলো। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আটক করার পর দেশটিতে নির্বাচনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ১৯৯৯ সাল থেকে ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শাসন চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা করলেও ভোট কবে হবে তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু মাদুরোর উত্তরসূরি বেছে নিতে ভোট কবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত ৩ জানুয়ারি থেকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে রয়েছেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ।
গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএসইউভি) থেকে উঠে এসেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন রদ্রিগেজের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানালেও, দলটির বিরুদ্ধে যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, কারাবন্দি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের পর ক্ষমতায় আসেন মাদুরো। এদিকে বিরোধী সমর্থকেরা তাদের বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করে কাছাকাছি অন্য একটি জায়গায় সমবেত হন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগতে পারে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো এক বিবৃতিতে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিতর্কিত ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রায় এক বছর আত্মগোপনে থাকা মাচাদো বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভেনতে ভেনেজুয়েলা’র আয়োজনে বৃহস্পতিবার রাজধানী কারাকাস, ভ্যালেন্সিয়া, মারাকাই, সান ক্রিস্তোবাল ও মারাকাইবোসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়।
মারাকাই শহরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৮ বছর বয়সী প্রসাধনবিদ্যার শিক্ষার্থী লিওসমারি হার্নান্দেজ জানান, নানা সংকট সত্ত্বেও দেশের পরিবর্তন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, ডলারের উত্থান ও শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও মারিয়া কোরিনার নেতৃত্বের ওপর তার অগাধ আস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতির কারণে ভয়ের চেয়ে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাই বেশি কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘এ দৃশ্য দেখে আমার ভালো লাগছে। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ডলারের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যা এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে অসুবিধাসহ অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। হার্নান্দেজ আরো বলেন, ‘আগেও আমি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি। এখন আমার ভয় আরো কম, কারণ আমি চাই আমার কণ্ঠস্বর শোনা হোক।’।
বিক্ষোভের দিন একই সময়ে ক্ষমতাসীন দল পিএসইউভিও নিজস্ব সমর্থকদের নিয়ে মিছিল বের করে। স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাসের ব্যানারে আয়োজিত এই মিছিলটি কারাকাসের প্লাজা ভেনেজুয়েলা থেকে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের দিকে যায়। সে সময় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল বেশ সীমিত এবং অনেক ছোট শহরেই অন্ধকার নামার আগে বিক্ষোভকারীরা নিরাপদে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ক্ষমতাসীন দলের মিছিলে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।
ভবিষ্যৎ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ও নির্বাচন কাউন্সিলে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধীদের একটি অংশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলন সরাসরি যুক্ত নয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার পথে তিনি কোনো বাধা সৃষ্টি করবেন না। দেশটির তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রদ্রিগেজ সরকারের ওপর সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। চলতি মাসে এ আলোচনার সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে।
২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে মাচাদোর সমর্থিত প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস উররুতিয়া জয়ী হয়েছিলেন বলে বিরোধীরা দাবি করে আসছে। তাদের সংগৃহীত ভোটের হিসাবের ভিত্তিতে এই দাবি করা হলেও সরকার কখনো পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করেনি। সে সময় দেশটির বিচার বিভাগ ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো মাদুরোর পক্ষে ভূমিকা রেখেছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মাচাদোর রাজনৈতিক অবস্থানের মিল রয়েছে এবং তিনি বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, মাদক চক্রের সঙ্গে মাদুরোর সংশ্লিষ্টতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বর্তমানে মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যদিও তারা শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছেন। হোয়াইট হাউসের সমর্থন নিয়ে দলটি ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
রিপোর্টার নাম: 























