বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার এবং উড়োজাহাজ অবতরণ বাবদ ২৭টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই বকেয়া আদায়ে সংস্থাটি নানামুখী চাপের মুখে পড়েছে। বেবিচকের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশাল অংকের অর্থ বকেয়া রয়েছে। ২৭ বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা ১১৪ কোটি টাকা। বিগ ব্যাশ খেলতে অনাপত্তিপত্র চেয়েছেন মোস্তাফিজ।
বকেয়া অংকের মধ্যে সিংহভাগই বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৮টি এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এছাড়া যারা এখনো আকাশসীমা ব্যবহার করছে বা নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে, এমন তিনটি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা ৪২ কোটি টাকা। এই তালিকায় রয়েছে ভারতের স্পাইসজেট, অ্যালায়েন্স এয়ার এবং তুর্কমেনিস্তান এয়ারলাইন্স। এর বাইরে ছয়টি এয়ারলাইন্স রয়েছে যারা হয় কার্যক্রম স্থগিত করেছে, না হয় অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত হয়ে গেছে; তাদের কাছে পাওনা ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এএআইয়ের ঋণনীতি অনুযায়ী, কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্স বা আকাশসীমা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া তার ব্যাংক গ্যারান্টির ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ সেই গ্যারান্টি ভাঙিয়ে টাকা আদায় করতে পারে। নির্ধারিত সময়ে টাকা না দিলে বকেয়া অর্থের ওপর মাসে ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করা যেতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে আগাম অর্থের বিনিময়ে সেবা নেওয়ার ব্যবস্থায় আনা যায়।
চলমান এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে স্পাইসজেটের কাছে পাওনা সবচেয়ে বেশি। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া বাবদ তাদের কাছে বেবিচক প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পায়। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এয়ার ডেকানের কাছে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বকেয়া ১৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং আলিতালিয়া এয়ারলাইন্সের কাছে ১৯৮৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪৪৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, আকাশসীমা ব্যবহারের ফি বা ওভারফ্লাইট ফি হিসেবে প্রতি উড়োজাহাজের আকার ও ওজন ভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ ডলার নেওয়া হয়। একটি উড়োজাহাজ আকাশসীমায় প্রবেশের পর বের হওয়া পর্যন্ত একবারই এই ফি প্রযোজ্য হয়, সময়ের ওপর ভিত্তি করে এর পরিবর্তন হয় না। নিয়ম অনুযায়ী, বিল দেওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হয় এয়ারলাইন্সগুলোকে। কত মিনিট আকাশসীমায় থাকল, তার ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হয় না।’। কোনো দেশের আকাশসীমায় অবতরণ না করে শুধু সেই আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এয়ারলাইন্সকে যে ফি দিতে হয়, তা ওভারফ্লাইট ফি বা আকাশপথ ব্যবহারের চার্জ হিসেবে পরিচিত।
বকেয়া আদায়ে বেবিচকের সদস্য (অর্থ) মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি জানান, আইনি লড়াইয়ের খরচ অনেক সময় পাওনা টাকার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। তবে এয়ারলাইন্সগুলোর অর্থ বিদেশে পাঠানোর ওপর বাধা সৃষ্টি করে কিছু ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন জেট এয়ারওয়েজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর আটকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসে বকেয়ার বিষয়ে চিঠি দিয়েছি। সর্বশেষ গত জুনেও এ ধরনের চিঠি পাঠানো হয়েছে।’। অতীতেও বেবিচকের সঙ্গে এ ধরনের বিষয় সমাধান করা হয়েছে।’।
স্পাইসজেটের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন যে, পাওনার হিসাব মেলানো নিয়ে তাদের আলোচনা চলছে। তবে তারা বেবিচকের পাওনার অংকের সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি। যদিও বকেয়া আদায়ে জটিলতা রয়েই গেছে, তবে সামগ্রিকভাবে আকাশসীমা ব্যবহার বাবদ বেবিচকের আয় বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আকাশপথ ব্যবহারের ফি থেকে আয় হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। একই সময়ে ফ্লাইট চলাচলের হারও বেড়েছে, যেখানে আট মাসে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৫১৬টি ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। এক্সপ্লেইনার / রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানী যে কারণে বাড়ছে না। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৫০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৪টি। তবে বেবিচকের পাওনার পরিমাণ তারা নিশ্চিতও করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি। তবে আয়ের এই বৃদ্ধি শুধু রাডার চালুর কারণে হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তারা। ভারতের অ্যারোনটিক্যাল ইনফরমেশন পাবলিকেশন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ এপ্রিল থেকে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা ও চেন্নাইয়ের ফ্লাইট ইনফরমেশন অঞ্চলের আকাশসীমা অতিক্রমকারী উড়োজাহাজের পথনির্দেশনা-সংক্রান্ত ফি সরাসরি আদায় করছে এএআই। দেশটির ২০২৩ সালের আকাশপথ ব্যবহারের ফি-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী, কলম্বোর ফ্লাইট ইনফরমেশন অঞ্চলের আকাশসীমা অতিক্রমকারী উড়োজাহাজকে বিল পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ফি পরিশোধ করতে হয়। এতে কোনো উড়োজাহাজের চলাচলের তথ্য নথিভুক্ত না হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।
নতুন রাডার ব্যবস্থার সুফল প্রসঙ্গে বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জানুয়ারিতে চালু হওয়া সমন্বিত রাডার ব্যবস্থা আকাশসীমা পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়োজাহাজের চলাচল এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই খাতের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে আকাশসীমা ব্যবহারের ফি সরাসরি ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ (এএআই) সংগ্রহ করে। তারা বকেয়া আদায়ে ব্যাংক গ্যারান্টি ভাঙানো বা ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধের মতো কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে। শ্রীলঙ্কাও একইভাবে বিল পরিশোধে ব্যর্থ এয়ারলাইন্সের ওপর সুদ আরোপের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ব্রাজিলে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসছেন বামপন্থী লুলা দা সিলভা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার সুযোগ থাকলেও বকেয়া আদায়ে তা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান জানান, বকেয়া জমে থাকার অন্যতম কারণ হলো বিল তৈরি ও অর্থ আদায়ের পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়তার অভাব। অনেক দেশেই এখন পেমেন্ট গেটওয়ে রয়েছে, যেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফি জমা হয়। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা কোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক আদালত নেই।’। সেখানে একটা পেমেন্ট গেটওয়ে থাকে, আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা চলে আসে।
সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান আরও স্বীকার করেন যে, অতীতে তাগাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কিছুটা শৈথিল্য ছিল। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় স্বয়ংক্রিয় বিলিং সিস্টেম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি পরামর্শ দেন, নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং কূটনৈতিক চ্যানেলের সর্বোচ্চ ব্যবহারই পাওনা আদায়ের মূল পথ হতে পারে।
রিপোর্টার নাম: 
























