Hi

০৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ: জেনে নিন মূল বিষয়গুলো

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে এই ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের জন্যই এই নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন রাজনীতিতে এ ভোটের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছরে কতটা নির্বিঘ্নে নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি কম থাকে। ১৯৪৪ সালের পর থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গড়ে ৫৮ শতাংশ ভোট পড়লেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে তা নেমে আসে চার দশকে। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, এবার ভোটার উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক হতে পারে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ইতিমধ্যেই আগাম ভোট গ্রহণ চলছে। ভোটারদের উপস্থিতি যদি ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো হয়, তবে এবারও প্রায় ১০ কোটির বেশি মার্কিন নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ রয়েছেন। শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের বেশি। ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-২ কোটি ৩২ লাখ। এরপর টেক্সাসে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং ফ্লোরিডায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট—উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস)। নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের আসনসংখ্যা ৪৩৫।

এ দুটি কক্ষের মূল কাজ হলো দেশের মূল আইন প্রণয়ন করা, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ব্যয় অনুমোদন করা এবং প্রশাসনের কাজের ওপর সরাসরি নজরদারি রাখা।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি সিনেটের মোট ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হবে, যার মধ্যে ৩৩টি সাধারণ মেয়াদের এবং বাকি ২টি শূন্য আসনের উপনির্বাচন। ফ্লোরিডা ও ওহাইওর যে দুটি আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে, সেগুলো আগে যথাক্রমে বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দখলে ছিল। তাঁরা পদত্যাগ করায় আসন দুটি খালি হয়। এ ছাড়া দেশের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনসহ স্থানীয় আইনসভার সদস্য পদেও এই একই দিনে ভোট নেওয়া হবে। আর যেখানে জনসংখ্যা কম, সেখানে আসন সংখ্যাও কম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এ নির্বাচন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে এই ভোটের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হন না, বরং আইনসভায় তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না তা চূড়ান্ত হয়। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্ট উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকা দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারায়। সাধারণত প্রেসিডেন্টের কাজ বা নীতিতে সাধারণ মানুষ কতটা সন্তুষ্ট, তা এ ভোটের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। যদি বিরোধী দল কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবে সরকারের আয়-ব্যয় অনুমোদন ও আইন তৈরির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর নাগরিকেরা সন্তুষ্ট কি না, তাও এতে প্রকাশ পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন পাসের প্রক্রিয়ায় দুই কক্ষের সমান সম্মতি প্রয়োজন। প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া কোনো বিলকে চূড়ান্ত করতে সিনেট থেকেও অনুমোদন নিতে হয়, যার পর তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়। তবে উভয় কক্ষেরই বেশ কিছু নিজস্ব বিশেষ একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের হাতে রয়েছে মূল সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করার অধিকার এবং প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিশংশনের প্রস্তাব আনার প্রাথমিক ক্ষমতা। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং সুপ্রিম কোর্টসহ কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারকদের নিয়োগ চূড়ান্ত অনুমোদনের এখতিয়ার সিনেটের হাতে ন্যস্ত থাকে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং তথ্য সংরক্ষণের জন্য বড় বড় ডেটা সেন্টার তৈরির ফলে মানুষের চাকরি, বিদ্যুতের চাহিদা ও খরচ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমান কংগ্রেসে ক্যাপিটল হিল বা আইনসভার উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে ২১৩টি আসন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক নম্বর ২১৮। অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৩৫টি আসনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শেষ পর্যন্ত কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে দেবে। ডেমোক্র্যাটরা যদি এবার প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারে, তবে নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হিসেবে ইতিহাস গড়তে পারেন। জেফরিস ইতিমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন এবং ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে সব ঘটনার তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সব সিনেটরের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হয় না। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ খুঁজতে থাকায় টেক্সাস ও কানসাসের আসনও আলোচনায় এসেছে।

অন্য দিকে উচ্চকক্ষ সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন রয়েছে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার পড়ে ৫১টি আসন। তবে কোনো প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সমপরিমাণ ভোট পড়ে গেলে ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্ধারক বা কাস্টিং ভোট দিতে পারেন। যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে রিপাবলিকানদের রয়েছে ২২টি এবং ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ১৩টি আসন। সিনেটে আধিপত্য পেতে হলে জর্জিয়া, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আলাস্কা ও আইওয়ার মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর ভোটের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের লড়াই হচ্ছে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্সের সঙ্গে। মেইনে রিপাবলিকান সুসান কলিন্সের বিপক্ষে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট সারা গিডন। এ ছাড়া টেক্সাস ও কানসাস অঙ্গরাজ্যের ফলাফলও এবার হিসাব-নিকাশ উল্টে দিতে পারে। অঙ্গরাজ্য যতই ছোট বা বড় হোক, জনসংখ্যা কম বা বেশি হোক, সিনেটে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সমান। এভাবে সিনেটে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩ জন সদস্য রয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটদের সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়া সদস্যের সংখ্যা ৪৭। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান হওয়ায় ৫০-৫০ সমতা হলেও তাঁর ভোটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও একটি শূন্য আসনে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাসের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন সুনুনু। এতে দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ ভোটার তাঁদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। অন্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চান ৫ শতাংশ।

আমেরিকান ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান সবচেয়ে প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ (২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর) অনুযায়ী, ভোটারদের মূল দুশ্চিন্তা খাদ্যপণ্যের দাম, পেট্রল ও জ্বালানি ব্যয়, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা খরচ। এ ছাড়া গর্ভপাত সংক্রান্ত নারী অধিকার, অভিবাসননীতি এবং সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে দেশের বড় অংশ সোচ্চার। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে দেশের নিরাপত্তা ভাবনাও সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করছে। জরিপে আরও উঠে এসেছে যে পুরুষ ভোটারদের মধ্যে দুই দলের প্রার্থীর সমর্থনই সমান ৪২ শতাংশ হলেও, নারী ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের দিকে কিছুটা বেশি ঝুঁকে রয়েছেন। ভোটারদের সমর্থন পেতে উভয় দলই নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম, বাড়িভাড়া, বাড়ি কেনার খরচ এবং চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের অন্তত একটিরও নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে পারে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। প্রতিবছর সরকারি কাজ চালু রাখতে প্রয়োজনীয় ১২টি সরকারি বাজেট ও বরাদ্দ বিল অনুমোদনের সময় ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবে। এমনকি বিচারক বা শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগও আটকে দিতে পারবে সিনেট। তবে ডেমোক্র্যাটরা বিল পাস করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিশেষ ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই আইন আটকে দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভেটো বাতিল করে কোনো বিল পাস করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ (অন্তত ৬৭ জন সিনেটরসহ) আইনপ্রণেতার ভোটের প্রয়োজন পড়বে, যা মার্কিন রাজনীতিতে অত্যন্ত কঠিন। এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কী ভূমিকা রেখেছে, তা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনেছিলেন। যদিও তাঁর এ ধরনের দাবির স্বপক্ষে কোনো আইনি বা তথ্যগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।

অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেনের হয়রানি বন্ধের দাবিতে ভোলায় মানববন্ধন

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ: জেনে নিন মূল বিষয়গুলো

আপডেট : ০২:১২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে এই ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের জন্যই এই নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন রাজনীতিতে এ ভোটের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছরে কতটা নির্বিঘ্নে নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি কম থাকে। ১৯৪৪ সালের পর থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গড়ে ৫৮ শতাংশ ভোট পড়লেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে তা নেমে আসে চার দশকে। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, এবার ভোটার উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক হতে পারে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ইতিমধ্যেই আগাম ভোট গ্রহণ চলছে। ভোটারদের উপস্থিতি যদি ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো হয়, তবে এবারও প্রায় ১০ কোটির বেশি মার্কিন নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ রয়েছেন। শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের বেশি। ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-২ কোটি ৩২ লাখ। এরপর টেক্সাসে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং ফ্লোরিডায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট—উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস)। নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের আসনসংখ্যা ৪৩৫।

এ দুটি কক্ষের মূল কাজ হলো দেশের মূল আইন প্রণয়ন করা, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ব্যয় অনুমোদন করা এবং প্রশাসনের কাজের ওপর সরাসরি নজরদারি রাখা।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি সিনেটের মোট ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হবে, যার মধ্যে ৩৩টি সাধারণ মেয়াদের এবং বাকি ২টি শূন্য আসনের উপনির্বাচন। ফ্লোরিডা ও ওহাইওর যে দুটি আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে, সেগুলো আগে যথাক্রমে বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দখলে ছিল। তাঁরা পদত্যাগ করায় আসন দুটি খালি হয়। এ ছাড়া দেশের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনসহ স্থানীয় আইনসভার সদস্য পদেও এই একই দিনে ভোট নেওয়া হবে। আর যেখানে জনসংখ্যা কম, সেখানে আসন সংখ্যাও কম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এ নির্বাচন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে এই ভোটের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হন না, বরং আইনসভায় তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না তা চূড়ান্ত হয়। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্ট উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকা দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারায়। সাধারণত প্রেসিডেন্টের কাজ বা নীতিতে সাধারণ মানুষ কতটা সন্তুষ্ট, তা এ ভোটের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। যদি বিরোধী দল কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবে সরকারের আয়-ব্যয় অনুমোদন ও আইন তৈরির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর নাগরিকেরা সন্তুষ্ট কি না, তাও এতে প্রকাশ পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন পাসের প্রক্রিয়ায় দুই কক্ষের সমান সম্মতি প্রয়োজন। প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া কোনো বিলকে চূড়ান্ত করতে সিনেট থেকেও অনুমোদন নিতে হয়, যার পর তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়। তবে উভয় কক্ষেরই বেশ কিছু নিজস্ব বিশেষ একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের হাতে রয়েছে মূল সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করার অধিকার এবং প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিশংশনের প্রস্তাব আনার প্রাথমিক ক্ষমতা। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং সুপ্রিম কোর্টসহ কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারকদের নিয়োগ চূড়ান্ত অনুমোদনের এখতিয়ার সিনেটের হাতে ন্যস্ত থাকে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং তথ্য সংরক্ষণের জন্য বড় বড় ডেটা সেন্টার তৈরির ফলে মানুষের চাকরি, বিদ্যুতের চাহিদা ও খরচ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমান কংগ্রেসে ক্যাপিটল হিল বা আইনসভার উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে ২১৩টি আসন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক নম্বর ২১৮। অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৩৫টি আসনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শেষ পর্যন্ত কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে দেবে। ডেমোক্র্যাটরা যদি এবার প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারে, তবে নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হিসেবে ইতিহাস গড়তে পারেন। জেফরিস ইতিমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন এবং ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে সব ঘটনার তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সব সিনেটরের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হয় না। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ খুঁজতে থাকায় টেক্সাস ও কানসাসের আসনও আলোচনায় এসেছে।

অন্য দিকে উচ্চকক্ষ সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন রয়েছে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার পড়ে ৫১টি আসন। তবে কোনো প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সমপরিমাণ ভোট পড়ে গেলে ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্ধারক বা কাস্টিং ভোট দিতে পারেন। যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে রিপাবলিকানদের রয়েছে ২২টি এবং ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ১৩টি আসন। সিনেটে আধিপত্য পেতে হলে জর্জিয়া, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আলাস্কা ও আইওয়ার মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর ভোটের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের লড়াই হচ্ছে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্সের সঙ্গে। মেইনে রিপাবলিকান সুসান কলিন্সের বিপক্ষে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট সারা গিডন। এ ছাড়া টেক্সাস ও কানসাস অঙ্গরাজ্যের ফলাফলও এবার হিসাব-নিকাশ উল্টে দিতে পারে। অঙ্গরাজ্য যতই ছোট বা বড় হোক, জনসংখ্যা কম বা বেশি হোক, সিনেটে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সমান। এভাবে সিনেটে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩ জন সদস্য রয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটদের সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়া সদস্যের সংখ্যা ৪৭। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান হওয়ায় ৫০-৫০ সমতা হলেও তাঁর ভোটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও একটি শূন্য আসনে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাসের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন সুনুনু। এতে দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ ভোটার তাঁদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। অন্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চান ৫ শতাংশ।

আমেরিকান ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান সবচেয়ে প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ (২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর) অনুযায়ী, ভোটারদের মূল দুশ্চিন্তা খাদ্যপণ্যের দাম, পেট্রল ও জ্বালানি ব্যয়, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা খরচ। এ ছাড়া গর্ভপাত সংক্রান্ত নারী অধিকার, অভিবাসননীতি এবং সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে দেশের বড় অংশ সোচ্চার। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে দেশের নিরাপত্তা ভাবনাও সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করছে। জরিপে আরও উঠে এসেছে যে পুরুষ ভোটারদের মধ্যে দুই দলের প্রার্থীর সমর্থনই সমান ৪২ শতাংশ হলেও, নারী ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের দিকে কিছুটা বেশি ঝুঁকে রয়েছেন। ভোটারদের সমর্থন পেতে উভয় দলই নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম, বাড়িভাড়া, বাড়ি কেনার খরচ এবং চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের অন্তত একটিরও নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে পারে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। প্রতিবছর সরকারি কাজ চালু রাখতে প্রয়োজনীয় ১২টি সরকারি বাজেট ও বরাদ্দ বিল অনুমোদনের সময় ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবে। এমনকি বিচারক বা শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগও আটকে দিতে পারবে সিনেট। তবে ডেমোক্র্যাটরা বিল পাস করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিশেষ ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই আইন আটকে দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভেটো বাতিল করে কোনো বিল পাস করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ (অন্তত ৬৭ জন সিনেটরসহ) আইনপ্রণেতার ভোটের প্রয়োজন পড়বে, যা মার্কিন রাজনীতিতে অত্যন্ত কঠিন। এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কী ভূমিকা রেখেছে, তা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনেছিলেন। যদিও তাঁর এ ধরনের দাবির স্বপক্ষে কোনো আইনি বা তথ্যগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।