Hi

১১:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসে উপেক্ষিত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তথ্য

  • রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর-লুট: গ্রেপ্তার আরও ২
  • যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে: রেহমান সোবহান
  • সেপ্টেম্বরে ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার: এইচআরএসএস
  • ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮

দলিত ও তফসিলি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমানের অভিন্ন স্বার্থ এবং উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। আজ শনিবার সেন্টারে আয়োজিত ‘ফিরে দেখা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল’ শীর্ষক ইতিহাস আড্ডার ৩১তম পর্বে এমনটাই উঠে এসেছে আলোচকদের বয়ানে। তিনি বলেন, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের অভিন্ন শ্রেণিগত বাস্তবতা থেকেই যোগেন্দ্রনাথ রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। সহকর্মীদের খোঁজে গাজীপুরে পোড়া পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের ভিড়। ইতিহাস আড্ডা-৩১ / ‘ইতিহাসে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে’।

গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ইতিহাসে প্রান্তিক মানুষের অবদানকে দীর্ঘদিন সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও তফসিলি জাতির অধিকারের প্রশ্নে আমরা দীর্ঘকাল পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করেছি। যেখানে ১৯৫৪ সালের জাতীয় সংসদে তফসিলি সম্প্রদায়ের ৩৭ জন প্রতিনিধি ছিলেন, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে এই সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধি নেই। বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র বিনির্মাণে তফসিলিদের সমর্থন থাকলেও ইতিহাসে তার পর্যাপ্ত স্বীকৃতি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি ‘বহুজনবাদী সমাজ’, যেখানে জন্মগত পরিচয়ের কারণে কেউ শোষিত বা বঞ্চিত হবে না।

আলতাফ পারভেজের মতে, শূদ্রের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মুসলমানের স্বার্থের এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মীয়তা ছিল, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে ছিল না। তবে ১৯৪৭ সালে শান্তির পরিবর্তে দাঙ্গা ও রক্তপাত জয়ী হয়। তিনি আরও জানান, ড. বি আর আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাতে যোগেন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কেবল যোগেন্দ্রনাথকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয় বলে তিনি মত দেন। একমাত্র তাহলেই পাওয়া যায় শূদ্রের এই স্বাধীনতা।

অধ্যাপক মুনিরা সুলতানা বলেন, যোগেন্দ্রনাথকে কেবল একজন দলিত নেতা হিসেবে চিহ্নিত করলে তার দর্শনের বিশালতা বোঝা সম্ভব নয়। তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল তফসিলি জাতির রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, সামাজিক সাম্য ও সংখ্যালঘু অধিকার। তিনি নিজের ‘শূদ্র’ পরিচয়কে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভিত্তি করেছিলেন। দেশভাগের পর তার স্বদেশ অনুসন্ধান কার্যত স্বদেশহীনতায় পর্যবসিত হয়েছিল, যা মুনিরা সুলতানার ভাষায়, ‘ইতিহাস ও সময়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ।’ দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথের স্বদেশ অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত স্বদেশহীনতার যাত্রায় পরিণত হয় উল্লেখ করে মুনিরা বলেন, বিভাজিত দেশে বিতাড়িত অস্পৃশ্য যোগেন স্বদেশকে হারিয়ে ফেললেন। তার ভাষায়, ‘যোগেন মণ্ডলরা হারিয়ে যান না, তাদের চেতনাটা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক থাকবে।’।

লেখক ও গবেষক হরিদাস ঠাকুরের মতে, যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন সব অধিকারহারা ও শ্রমজীবী মানুষের নেতা। ১৯৪৬ সালে গণপরিষদে আম্বেদকরের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে তিনি ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে উর্দুর বদলে বাংলাকে গ্রহণের পক্ষে তিনি জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মোহভঙ্গ হলে ১৯৫০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তাকে দেশভাগের জন্য দায়ী করার প্রবণতাকে হরিদাস ‘ইতিহাসের অজ্ঞতা’ বলে অভিহিত করেন এবং তার চেতনাকে আজও প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন। বলেন, ১৯৪৬ সালে গণপরিষদে নির্বাচিত হয়ে আম্বেদকরকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই ইতিহাস আড্ডায় সূচনা বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও গবেষক সামসুদ্দোজা সাজেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া আড্ডায় আলতাফ পারভেজ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়েও তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

জনপ্রিয়

ভোলায় সাংবাদিকের বাসায় দুর্ধর্ষ সম্পদ সংক্রান্ত ঘটনায়

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

ইতিহাসে উপেক্ষিত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

আপডেট : ০৯:৫১:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তথ্য

  • রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর-লুট: গ্রেপ্তার আরও ২
  • যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে: রেহমান সোবহান
  • সেপ্টেম্বরে ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার: এইচআরএসএস
  • ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮

দলিত ও তফসিলি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমানের অভিন্ন স্বার্থ এবং উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। আজ শনিবার সেন্টারে আয়োজিত ‘ফিরে দেখা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল’ শীর্ষক ইতিহাস আড্ডার ৩১তম পর্বে এমনটাই উঠে এসেছে আলোচকদের বয়ানে। তিনি বলেন, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের অভিন্ন শ্রেণিগত বাস্তবতা থেকেই যোগেন্দ্রনাথ রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। সহকর্মীদের খোঁজে গাজীপুরে পোড়া পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের ভিড়। ইতিহাস আড্ডা-৩১ / ‘ইতিহাসে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে’।

গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ইতিহাসে প্রান্তিক মানুষের অবদানকে দীর্ঘদিন সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও তফসিলি জাতির অধিকারের প্রশ্নে আমরা দীর্ঘকাল পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করেছি। যেখানে ১৯৫৪ সালের জাতীয় সংসদে তফসিলি সম্প্রদায়ের ৩৭ জন প্রতিনিধি ছিলেন, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে এই সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধি নেই। বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র বিনির্মাণে তফসিলিদের সমর্থন থাকলেও ইতিহাসে তার পর্যাপ্ত স্বীকৃতি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি ‘বহুজনবাদী সমাজ’, যেখানে জন্মগত পরিচয়ের কারণে কেউ শোষিত বা বঞ্চিত হবে না।

আলতাফ পারভেজের মতে, শূদ্রের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মুসলমানের স্বার্থের এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মীয়তা ছিল, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে ছিল না। তবে ১৯৪৭ সালে শান্তির পরিবর্তে দাঙ্গা ও রক্তপাত জয়ী হয়। তিনি আরও জানান, ড. বি আর আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাতে যোগেন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কেবল যোগেন্দ্রনাথকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয় বলে তিনি মত দেন। একমাত্র তাহলেই পাওয়া যায় শূদ্রের এই স্বাধীনতা।

অধ্যাপক মুনিরা সুলতানা বলেন, যোগেন্দ্রনাথকে কেবল একজন দলিত নেতা হিসেবে চিহ্নিত করলে তার দর্শনের বিশালতা বোঝা সম্ভব নয়। তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল তফসিলি জাতির রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, সামাজিক সাম্য ও সংখ্যালঘু অধিকার। তিনি নিজের ‘শূদ্র’ পরিচয়কে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভিত্তি করেছিলেন। দেশভাগের পর তার স্বদেশ অনুসন্ধান কার্যত স্বদেশহীনতায় পর্যবসিত হয়েছিল, যা মুনিরা সুলতানার ভাষায়, ‘ইতিহাস ও সময়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ।’ দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথের স্বদেশ অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত স্বদেশহীনতার যাত্রায় পরিণত হয় উল্লেখ করে মুনিরা বলেন, বিভাজিত দেশে বিতাড়িত অস্পৃশ্য যোগেন স্বদেশকে হারিয়ে ফেললেন। তার ভাষায়, ‘যোগেন মণ্ডলরা হারিয়ে যান না, তাদের চেতনাটা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক থাকবে।’।

লেখক ও গবেষক হরিদাস ঠাকুরের মতে, যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন সব অধিকারহারা ও শ্রমজীবী মানুষের নেতা। ১৯৪৬ সালে গণপরিষদে আম্বেদকরের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে তিনি ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে উর্দুর বদলে বাংলাকে গ্রহণের পক্ষে তিনি জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মোহভঙ্গ হলে ১৯৫০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তাকে দেশভাগের জন্য দায়ী করার প্রবণতাকে হরিদাস ‘ইতিহাসের অজ্ঞতা’ বলে অভিহিত করেন এবং তার চেতনাকে আজও প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন। বলেন, ১৯৪৬ সালে গণপরিষদে নির্বাচিত হয়ে আম্বেদকরকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই ইতিহাস আড্ডায় সূচনা বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও গবেষক সামসুদ্দোজা সাজেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া আড্ডায় আলতাফ পারভেজ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়েও তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।