রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ম্যানেজার ওয়াসিউর রহমান। তাঁর অধীনে ২০ জন কর্মী কাজ করেন। প্রতিদিন মাঠপর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ, গ্রাহক সামলানো এবং পেশাগত মান ধরে রাখতে ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকাসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁকে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বড় অংকের ব্যয় করতে হয়। কিন্তু বছর শেষে বেতন যে হারে বাড়ে, তা ক্রমবর্ধমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মাস শেষে সংসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রাজধানীর কাজীপাড়ায় থাকেন ওয়াসিউর রহমান। প্রতিদিন তাঁকে ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে হয়, নানা খাতের গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি করতে হয়। মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে পকেটে টান পড়ে তাঁর। ইনক্রিমেন্টের খাতা ইতিবাচক দেখালেও কেনাকাটার বাজারে গিয়ে কর্মী প্রতিদিন এই আয়ের ঘাটতি টের পাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, তিনি মিরপুরের একটি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে মধ্যম সারিতে কাজ করেন।
ওয়াসিউর রহমানের মতো দেশের অসংখ্য বেসরকারি কর্মীর গল্প প্রায় একই। কাজের ধরন ও পদ ভিন্ন হলেও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও চাকরির আনুষঙ্গিক খরচ সামলাতে গিয়ে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে আছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের এই আর্থিক টানাপোড়েনের প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। কাজের ক্ষেত্র ও পদ আলাদা হলেও নিত্যপণ্যের চড়া দাম এবং চাকরির নিজস্ব বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী। সহজ কথায়, উপার্জনের তুলনায় নিত্যদিনের খরচের বাড়বাড়ন্তই সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অবস্থা আরও নাজুক। উত্তরায় একটি বায়িং হাউসে জুনিয়র কর্মী হিসেবে কর্মরত সোহেল রানা জানান, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে বিভিন্ন কারখানায় ঘুরতে হয় তাঁকে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যাতায়াত ও দুপুরের খাবারের পেছনে বেতনের বড় অংশ চলে যায়। প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত যাতায়াত ভাতা বাস্তব খরচের তুলনায় খুবই নগণ্য। তিনি জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টানা যাতায়াত এবং দুপুরে বাইরে খাওয়ার পেছনেই তাঁর বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়।
বিগত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়ালেও, গত পাঁচ বছরের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। সহজ কথায়, পাঁচ বছর আগে যে জীবনযাত্রার মান ২০ হাজার টাকায় সম্ভব ছিল, আজ তার জন্য ৩০ হাজার ৪০০ টাকার প্রয়োজন। ধারাবাহিক এই হারগুলো হিসাব করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে সাধারণ জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে আনুমানিক ৫২ শতাংশ। এর সরল হিসাব হলো—পাঁচ বছর আগে একজন কর্মী যে পণ্য ও সেবা ২০ হাজার টাকায় কিনতে পারতেন, আজ একই জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে তাঁর লাগছে প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আয় যে গতিতে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে।
বেতন কাঠামো ও ইনক্রিমেন্টের হিসাবেও বড় ঘাটতি দৃশ্যমান। ধরা যাক, পাঁচ বছর আগে বেতন ছিল ২০ হাজার টাকা। প্রতিবছর ১ হাজার ৫০০ টাকা ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে বর্তমানে বেতন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু ৫২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপে ওই কর্মীর মাসিক চাহিদা বর্তমানে ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ, নিয়মতান্ত্রিক বেতন বাড়লেও প্রতি মাসে ২ হাজার ৯০০ টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তিনি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হতে পারে) করে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও থমকে গেছে। করপোরেট পরিবেশ বজায় রাখার অদৃশ্য চাপ ও পরিবারের চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া কর্মীরা সঞ্চয় করতে পারছেন না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ত্রুটি ও বড় আকারের বাজেটের ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থাকায় অতিরিক্ত শ্রমিকের জোগানের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ নামমাত্র বেতন বাড়ায়। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো না থাকায় কোম্পানিভেদে বেতনের তফাত বিশাল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সংকটের ব্যাপ্তি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো পদে সীমাবদ্ধ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন এই সংকটের সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সুদের হার ও রেপো রেট বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলের মতো পণ্যের শুল্ক কমিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা জরুরি। সরকারি প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস এবং বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রবিধান ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল কর্মীদের দর-কষাকষির সক্ষমতা ফিরবে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময় অন্যান্য দেশ কঠোর মুদ্রানীতি নিলেও বাংলাদেশে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো এবং ক্রমাগত বাজেটের আকার বড় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চাকরির বাজারে অন্যান্য খবরের মধ্যে বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে পিএসসির উদ্যোগ ও কানাডায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৃত্তির সুযোগ সংক্রান্ত খবরও আলোচিত হচ্ছে।
রিপোর্টার নাম: 


























