Hi

১২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক অস্বস্তি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার (এফসিসি) উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল মতবিনিময় সভায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন উসকানিমূলক মন্তব্য করেন, যা নিয়ে ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগেই ভারতীয় লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি তাদের এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের হাইকমিশনারের কাছে জোরালো কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো পলাতক আসামি যেন ভারতের মাটিতে বসে দেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ না পান। এর পরও কীভাবে এবং কার সম্মতিতে এই ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হলো, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ভারতীয় পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে হাসিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কোনো অনুমোদন নেই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় একে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিষয়টি নিয়ে খোদ ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এ বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে আইনি জটিলতার কারণে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এক হলেও, ভারতের ভূমিকে কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও সমস্যাযুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি সময়ে এই ঘটনা ঘটে গেল, যখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ দেড় বছরের টানাপোড়েন কাটিয়ে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক ধারা তৈরি হচ্ছিল। সম্প্রতি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ও পানিবণ্টন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদী ঝুলে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু এই সংবেদনশীল সময়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে বসে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের কার্যক্রম দুই দেশের আস্থার সম্পর্কে মারাত্মক ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ সব সময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পররাষ্ট্রনীতিতে অটল রয়েছে। কিন্তু ২০১৩ সালের অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির তোয়াক্কা না করে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘসূত্রিতা এবং তাদের মাটিতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দেওয়া কোনোভাবেই সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, ১৭ কোটি মানুষের একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়ায়ী ও টেকসই সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে দিল্লিকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অপতৎপরতা দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই জিম্মি করতে দেওয়া উচিত নয়।

জনপ্রিয়

ফরাসি খাদ্যসংস্কৃতিতে পনিরের রাজত্ব এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত চার কিংবদন্তি বিদেশি পনির

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক অস্বস্তি

আপডেট : ০৯:৫০:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার (এফসিসি) উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল মতবিনিময় সভায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন উসকানিমূলক মন্তব্য করেন, যা নিয়ে ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগেই ভারতীয় লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি তাদের এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের হাইকমিশনারের কাছে জোরালো কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো পলাতক আসামি যেন ভারতের মাটিতে বসে দেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ না পান। এর পরও কীভাবে এবং কার সম্মতিতে এই ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হলো, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ভারতীয় পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে হাসিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কোনো অনুমোদন নেই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় একে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিষয়টি নিয়ে খোদ ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এ বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে আইনি জটিলতার কারণে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এক হলেও, ভারতের ভূমিকে কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও সমস্যাযুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি সময়ে এই ঘটনা ঘটে গেল, যখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ দেড় বছরের টানাপোড়েন কাটিয়ে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক ধারা তৈরি হচ্ছিল। সম্প্রতি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ও পানিবণ্টন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদী ঝুলে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু এই সংবেদনশীল সময়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে বসে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের কার্যক্রম দুই দেশের আস্থার সম্পর্কে মারাত্মক ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ সব সময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পররাষ্ট্রনীতিতে অটল রয়েছে। কিন্তু ২০১৩ সালের অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির তোয়াক্কা না করে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘসূত্রিতা এবং তাদের মাটিতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দেওয়া কোনোভাবেই সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, ১৭ কোটি মানুষের একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়ায়ী ও টেকসই সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে দিল্লিকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অপতৎপরতা দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই জিম্মি করতে দেওয়া উচিত নয়।