Hi

০৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কূটনীতির পর্দার আড়াল: সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসানের নতুন স্মৃতিকথা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির চালচিত্র

বাংলাদেশের কূটনীতি ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্দরমহলে এক নির্মোহ এবং অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসান। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ‘সেরেনডিপিটি ডিপ্লোমেসি: বিটুইন প্রটোকল অ্যান্ড পলিটিকস: আ মেমোয়ার’ কেবল একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত কর্মজীবনের খতিয়ান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিগত কয়েক দশকের বৈদেশিক সম্পর্ক, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর এক প্রদীপ্ত দলিল। সাধারণত আমলাদের আত্মজীবনীতে আত্মপক্ষ সমর্থন বা প্রটোকল রক্ষা করার একটা রক্ষণশীল প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, মাহমুদ হাসান সে বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসে খোলামেলাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্য ইতিহাস এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন।

বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে স্নায়ুযুদ্ধের জটিল বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক কূটনীতির নানা অজানা অধ্যায়। বিশেষ করে, ১৯৮৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সপ্তম জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে লেখক যেভাবে এরশাদ সরকারের প্রতিনিধিদলের সর্বকনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে নিজের বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তা অত্যন্ত নাটকীয় ও শিক্ষণীয়। ফিদেল কাস্ত্রো ও ইন্দিরা গান্ধীর বিখ্যাত আলিঙ্গন কিংবা কাম্পুচিয়া সংকটকে ঘিরে সিঙ্গাপুর ও কিউবার মধ্যকার প্রক্সি বাগ্‌যুদ্ধের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। একই সঙ্গে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের চিঠিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাওয়ের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের ঘটনা বাংলাদেশের তৎকালীন বাস্তববাদী বৈদেশিক নীতিরই পরিচায়ক।

কাবুলে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে লেখকের দায়িত্ব পালনকালীন অধ্যায়টি ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। সোভিয়েত অধিকৃত আফগানিস্তানে নজিবুল্লাহ সরকারকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় তাঁকে যে কৌশলগত নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা তিনি ‘এশিয়ান গ্রুপ’ গঠনের মাধ্যমে মোকাবিলা করেন। পাশাপাশি, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে আফগানিস্তানকে সার্কে অন্তর্ভুক্ত করার চাপ এবং তার সমস্ত দায় একজন তরুণ কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতাকেই নগ্নভাবে উন্মোচন করে। একইভাবে, মিয়ানমারের রেঙ্গুনে দায়িত্ব পালনের সময় সামরিক জান্তার দমনপীড়ন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ এবং অং সান সু চির উত্থানপর্ব তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যা পরবর্তী দশকের মানবিক বিপর্যয়ের সঠিক পূর্বাভাস ছিল।

স্মৃতিকথার শেষাংশে এবং পরবর্তী কর্মজীবনে ভারতের রাজনীতি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বা পোখরান পারমাণবিক পরীক্ষার পর দক্ষিণ এশিয়ার ছদ্ম-জাতীয়তাবাদী উত্তেজনার চমৎকার বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তবে গ্রন্থটির সবচেয়ে জোরালো বার্তাটি নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সিভিল সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মূল্যায়নে। সামান্য কেরানিগত ভুলের জন্য লেখককে অন্যায়ভাবে ওএসডি করার মতো ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির জবাবদিহিহীনতা ও রাজনৈতিককরণের করুণ চিত্র তুলে ধরে। দিনশেষে, এই স্মৃতিকথা কেবল পেশাদার কূটনীতিক বা গবেষকদের জন্যই নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মেধাভিত্তিক ও কৌশলগত বৈদেশিক নীতি পুনর্গঠনের তাগিদ অনুভব করতে প্রত্যেক সচেতন পাঠকের জন্যই এক অবশ্যপাঠ্য সংযোজন।

জনপ্রিয়

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান টানাপোড়েন: কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে?

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

কূটনীতির পর্দার আড়াল: সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসানের নতুন স্মৃতিকথা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির চালচিত্র

আপডেট : ০৭:২২:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের কূটনীতি ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্দরমহলে এক নির্মোহ এবং অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসান। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ‘সেরেনডিপিটি ডিপ্লোমেসি: বিটুইন প্রটোকল অ্যান্ড পলিটিকস: আ মেমোয়ার’ কেবল একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত কর্মজীবনের খতিয়ান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিগত কয়েক দশকের বৈদেশিক সম্পর্ক, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর এক প্রদীপ্ত দলিল। সাধারণত আমলাদের আত্মজীবনীতে আত্মপক্ষ সমর্থন বা প্রটোকল রক্ষা করার একটা রক্ষণশীল প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, মাহমুদ হাসান সে বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসে খোলামেলাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্য ইতিহাস এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন।

বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে স্নায়ুযুদ্ধের জটিল বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক কূটনীতির নানা অজানা অধ্যায়। বিশেষ করে, ১৯৮৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সপ্তম জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে লেখক যেভাবে এরশাদ সরকারের প্রতিনিধিদলের সর্বকনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে নিজের বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তা অত্যন্ত নাটকীয় ও শিক্ষণীয়। ফিদেল কাস্ত্রো ও ইন্দিরা গান্ধীর বিখ্যাত আলিঙ্গন কিংবা কাম্পুচিয়া সংকটকে ঘিরে সিঙ্গাপুর ও কিউবার মধ্যকার প্রক্সি বাগ্‌যুদ্ধের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। একই সঙ্গে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের চিঠিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাওয়ের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের ঘটনা বাংলাদেশের তৎকালীন বাস্তববাদী বৈদেশিক নীতিরই পরিচায়ক।

কাবুলে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে লেখকের দায়িত্ব পালনকালীন অধ্যায়টি ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। সোভিয়েত অধিকৃত আফগানিস্তানে নজিবুল্লাহ সরকারকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় তাঁকে যে কৌশলগত নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা তিনি ‘এশিয়ান গ্রুপ’ গঠনের মাধ্যমে মোকাবিলা করেন। পাশাপাশি, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে আফগানিস্তানকে সার্কে অন্তর্ভুক্ত করার চাপ এবং তার সমস্ত দায় একজন তরুণ কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতাকেই নগ্নভাবে উন্মোচন করে। একইভাবে, মিয়ানমারের রেঙ্গুনে দায়িত্ব পালনের সময় সামরিক জান্তার দমনপীড়ন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ এবং অং সান সু চির উত্থানপর্ব তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যা পরবর্তী দশকের মানবিক বিপর্যয়ের সঠিক পূর্বাভাস ছিল।

স্মৃতিকথার শেষাংশে এবং পরবর্তী কর্মজীবনে ভারতের রাজনীতি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বা পোখরান পারমাণবিক পরীক্ষার পর দক্ষিণ এশিয়ার ছদ্ম-জাতীয়তাবাদী উত্তেজনার চমৎকার বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তবে গ্রন্থটির সবচেয়ে জোরালো বার্তাটি নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সিভিল সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মূল্যায়নে। সামান্য কেরানিগত ভুলের জন্য লেখককে অন্যায়ভাবে ওএসডি করার মতো ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির জবাবদিহিহীনতা ও রাজনৈতিককরণের করুণ চিত্র তুলে ধরে। দিনশেষে, এই স্মৃতিকথা কেবল পেশাদার কূটনীতিক বা গবেষকদের জন্যই নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মেধাভিত্তিক ও কৌশলগত বৈদেশিক নীতি পুনর্গঠনের তাগিদ অনুভব করতে প্রত্যেক সচেতন পাঠকের জন্যই এক অবশ্যপাঠ্য সংযোজন।