২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানি খাতের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরটি শুরু হয়েছিল দারুণ আশাবাদ নিয়ে। জুলাই মাসে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। বছরের শেষ মাস জুনেও রপ্তানি আয়ে দেখা গেছে বড় ধরনের উল্লম্ফন। কিন্তু এই দুই প্রান্তের চমক সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে অর্থবছরটি শেষ হয়েছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ হলো তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত, যা মোট আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে আছে। তবে এই খাতটি গত অর্থবছরে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারিয়েছে। পোশাক খাতের এই মন্দার পেছনে বিশ্ববাজারে দুর্বল চাহিদা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। নিট ও ওভেন—উভয় উপখাতেই রপ্তানি আয়ের পতন লক্ষ্য করা গেছে। যদিও জুন মাসে পোশাক রপ্তানিতে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা এটিকে গত বছরের একই সময়ের ‘বেস ইফেক্ট’ বা তুলনামূলক দুর্বল ভিত্তির ফল হিসেবেই দেখছেন।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ভারত ও ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং মজুরি বৃদ্ধির চাপ কারখানা মালিকদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
তবে এই নেতিবাচক ধারার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে কিছু খাত। প্রকৌশল পণ্যে ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ইপিবি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির মতো প্রতিকূল পরিবেশেও রপ্তানি আয় প্রায় স্থিতিশীল রাখা দেশের অর্থনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতারই প্রমাণ। এখন দেখার বিষয়, নতুন অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে কি না।
রিপোর্টার নাম: 



















