জামালপুর জেলায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় চরম সংকট তৈরি হয়েছে। জেলার এক হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও কম প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় একদিকে যেমন প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে নতুন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জামালপুর জেলায় মোট ১ হাজার ১৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির জন্যই একটি করে প্রধান শিক্ষকের পদ অনুমোদিত থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬২৪ জন। এর ফলে ৫৪০টি বা প্রায় ৪৬ শতাংশ বিদ্যালয়েই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। বাধ্য হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও আবার সহকারী শিক্ষকের পদগুলোও শূন্য থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জামালপুর পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এই সংকটের অন্যতম বড় উদাহরণ। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া এই বিদ্যালয়টিতে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কখনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সহকারী শিক্ষক সূরাফীয়া আক্তারের ওপর। তাঁর মতে, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের যাবতীয় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত দুরূহ। একই চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার খুপীবাড়ী, চালাপাড়া, তীর্থ সত্যপীর, বকশীগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া উমর এবং মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও।
শিক্ষক ও স্থানীয় শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয় পরিচালনার মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টন, পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিখন কার্যক্রমের নিয়মিত তদারকি, সরকারের নীতিনির্ধারণী নির্দেশনা বাস্তবায়ন, মাসিক প্রতিবেদন তৈরি, আর্থিক হিসাব-নিকাশ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। জিনিয়া উমর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. শিউলি আক্তার জানান, অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের কারণে শিক্ষকরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব থেকে মনোযোগ হারাচ্ছেন।
এদিকে দেশজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যতার চিত্রটি আরও বড়। বিগত বছরগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। জামালপুর জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোড়. হারুন-অর-রশিদ জানিয়েছেন, সর্বশেষ বিদ্যালয় জাতীয়করণের প্রক্রিয়ার পর কিছু শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের পদমর্যাদা ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট ও মামলা করেছিলেন। এই আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদগুলোতে নতুন করে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে এসব মামলার আইনি সুরাহা হতে শুরু করেছে এবং জটিলতা কেটে গেলে খুব দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড গড়ার প্রথম সোপান। এই স্তরে যদি সঠিক তদারকি ও নেতৃত্ব না থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামালপুরসহ সারা দেশের শূন্য পদগুলোতে মেধাবী ও যোগ্য প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জোরালো দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ।
রিপোর্টার নাম: 





















