Hi

১২:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি পারমাণবিক চুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের ভোলবদল: আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত হওয়ার নতুন শর্ত

প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে দুই দেশের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিলেন সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী। তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আকস্মিক ঘোষণায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, এই পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে হলে রিয়াদকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করতে হবে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্তারোপ কেবল হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকেই প্রকাশ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

চুক্তির পেছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা গতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সৌদি প্রতিনিধিদলের যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল মূলত বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। তবে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা বা অ্যাডিশনাল প্রটোকল বাধ্যতামূলক না রাখার বিষয়টি নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাঁদের মতে, কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ছাড়া সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে আসছিল যে নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নাটকীয় মোড় নেয়। মার্কিন রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ও থিংক ট্যাংকগুলো কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়া এই চুক্তি স্বাক্ষরের তীব্র সমালোচনা শুরু করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ফক্স নিউজের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো প্রশ্ন তোলে, অতীতে বাইডেন প্রশাসন যে শর্তে সৌদি আরবকে এই চুক্তির প্রস্তাব দিতে চেয়েছিল—অর্থাৎ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগদানের বাধ্যবাধকতা—ট্রাম্প প্রশাসন কেন সেই কৌশলগত কার্ডটি অবলীলায় হারিয়ে ফেলল। এই অভ্যন্তরীণ চাপ এবং রক্ষণশীল মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং নতুন শর্ত জুড়ে দেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জানানো হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় এনে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

এদিকে ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্তারোপের ফলে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট প্রেসিডেন্টের পূর্ণ সম্মতি না নিয়েই তাড়াহুড়ো করে চুক্তিটি ঘোষণা করে দেন, যা হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি কংগ্রেসে পাঠানোর প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগেই চুক্তি ঘোষণার বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরের সমন্বয়হীনতাকে প্রকট করে তুলেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও হোয়াইট হাউস তা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহুকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক চুক্তিটি এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং আগামী দিনে রিয়াদ এই নতুন রাজনৈতিক শর্ত মেনে নেবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জনপ্রিয়

টিকার প্রতি অনীহা: যুক্তরাষ্ট্রে গত সাড়ে তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রকোপ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সৌদি পারমাণবিক চুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের ভোলবদল: আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত হওয়ার নতুন শর্ত

আপডেট : ১১:১৩:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে দুই দেশের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিলেন সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী। তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আকস্মিক ঘোষণায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, এই পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে হলে রিয়াদকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করতে হবে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্তারোপ কেবল হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকেই প্রকাশ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

চুক্তির পেছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা গতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সৌদি প্রতিনিধিদলের যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল মূলত বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। তবে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা বা অ্যাডিশনাল প্রটোকল বাধ্যতামূলক না রাখার বিষয়টি নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাঁদের মতে, কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ছাড়া সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে আসছিল যে নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নাটকীয় মোড় নেয়। মার্কিন রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ও থিংক ট্যাংকগুলো কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়া এই চুক্তি স্বাক্ষরের তীব্র সমালোচনা শুরু করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ফক্স নিউজের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো প্রশ্ন তোলে, অতীতে বাইডেন প্রশাসন যে শর্তে সৌদি আরবকে এই চুক্তির প্রস্তাব দিতে চেয়েছিল—অর্থাৎ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগদানের বাধ্যবাধকতা—ট্রাম্প প্রশাসন কেন সেই কৌশলগত কার্ডটি অবলীলায় হারিয়ে ফেলল। এই অভ্যন্তরীণ চাপ এবং রক্ষণশীল মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং নতুন শর্ত জুড়ে দেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জানানো হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় এনে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

এদিকে ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্তারোপের ফলে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট প্রেসিডেন্টের পূর্ণ সম্মতি না নিয়েই তাড়াহুড়ো করে চুক্তিটি ঘোষণা করে দেন, যা হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি কংগ্রেসে পাঠানোর প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগেই চুক্তি ঘোষণার বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরের সমন্বয়হীনতাকে প্রকট করে তুলেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও হোয়াইট হাউস তা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহুকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক চুক্তিটি এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং আগামী দিনে রিয়াদ এই নতুন রাজনৈতিক শর্ত মেনে নেবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।