Hi

০৯:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি: বীর পুলিশ সদস্যদের স্মৃতির অবমাননা ও মুছে যাওয়া ইতিহাসের ক্ষত

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। সেই রাতে জিম্মিদের উদ্ধারে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড ও গুলিতে প্রাণ হারান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ কেবল পুলিশ বাহিনীর জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছিল। এই বীরত্বকে সম্মান জানাতে গুলশান থানার সামনে নির্মিত হয়েছিল ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য, আর ডিবি কার্যালয়ের ফটকটি উৎসর্গ করা হয়েছিল রবিউল করিমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী অস্থিরতায় এই স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ বিলীন। গুলশান থানার সামনের সেই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের ফটক থেকে মুছে ফেলা হয়েছে রবিউল করিমের নাম। এই ভাঙচুর কেবল ইট-পাথরের স্থাপনার ক্ষতি নয়, এটি আমাদের বীরদের অবদানের প্রতি এক প্রকার অবজ্ঞা ও ইতিহাসের বিকৃতির নামান্তর। যারা দেশ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের সম্পদ নন; তাঁরা পুরো জাতির গর্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের আলোকবর্তিকা।

শহীদ রবিউল করিমের ছোট ভাই ও সাংবাদিক শামসুজ্জামান শামসের ভাষ্যমতে, এই বীরদের স্মৃতিচিহ্নগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরি করত। হাতুড়ির আঘাতে সেই স্মারকগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ফলে আজ তরুণ প্রজন্ম এই অকুতোভয় পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও পুলিশ বাহিনীর একাংশ এবং সাধারণ মানুষ এখনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহীদদের স্মরণ করছেন এবং রবিউল করিমের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই স্মৃতিগুলো সংরক্ষণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সচেতন মহলের দাবি, শহীদ রবিউল ও সালাউদ্দিনের মতো দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। শুধু ভাস্কর্য বা নামফলক নয়, বরং এই বীরদের সাহসিকতার গল্পগুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসের এই ক্ষতগুলো মুছে ফেলে নয়, বরং বীরদের যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারি। রবিউল ও সালাউদ্দিনরা বেঁচে থাকুক আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁদের এই ত্যাগের কথা জেনে অনুপ্রাণিত হতে পারে।

জনপ্রিয়

কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি: বীর পুলিশ সদস্যদের স্মৃতির অবমাননা ও মুছে যাওয়া ইতিহাসের ক্ষত

আপডেট : ০৩:৩৮:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। সেই রাতে জিম্মিদের উদ্ধারে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড ও গুলিতে প্রাণ হারান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ কেবল পুলিশ বাহিনীর জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছিল। এই বীরত্বকে সম্মান জানাতে গুলশান থানার সামনে নির্মিত হয়েছিল ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য, আর ডিবি কার্যালয়ের ফটকটি উৎসর্গ করা হয়েছিল রবিউল করিমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী অস্থিরতায় এই স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ বিলীন। গুলশান থানার সামনের সেই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের ফটক থেকে মুছে ফেলা হয়েছে রবিউল করিমের নাম। এই ভাঙচুর কেবল ইট-পাথরের স্থাপনার ক্ষতি নয়, এটি আমাদের বীরদের অবদানের প্রতি এক প্রকার অবজ্ঞা ও ইতিহাসের বিকৃতির নামান্তর। যারা দেশ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের সম্পদ নন; তাঁরা পুরো জাতির গর্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের আলোকবর্তিকা।

শহীদ রবিউল করিমের ছোট ভাই ও সাংবাদিক শামসুজ্জামান শামসের ভাষ্যমতে, এই বীরদের স্মৃতিচিহ্নগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরি করত। হাতুড়ির আঘাতে সেই স্মারকগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ফলে আজ তরুণ প্রজন্ম এই অকুতোভয় পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও পুলিশ বাহিনীর একাংশ এবং সাধারণ মানুষ এখনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহীদদের স্মরণ করছেন এবং রবিউল করিমের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই স্মৃতিগুলো সংরক্ষণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সচেতন মহলের দাবি, শহীদ রবিউল ও সালাউদ্দিনের মতো দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। শুধু ভাস্কর্য বা নামফলক নয়, বরং এই বীরদের সাহসিকতার গল্পগুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসের এই ক্ষতগুলো মুছে ফেলে নয়, বরং বীরদের যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারি। রবিউল ও সালাউদ্দিনরা বেঁচে থাকুক আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁদের এই ত্যাগের কথা জেনে অনুপ্রাণিত হতে পারে।