আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষভাগে নাটকীয়ভাবে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। শুক্রবার আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন তাঁর নাম রাষ্ট্রপতি পদে ঘোষণা করা হয়, তখন খোদ ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারাও বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ে তাঁর নাম কোনো আলোচনাতেই ছিল না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহেনার যৌথ সিদ্ধান্তে তাঁকে এই পদে বসানো হয় বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল। তবে বিচারক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে তাঁর বিতর্কিত অতীত এবং পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদকের কমিশনার থাকাকালীন তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা সময় বিতর্ক তৈরি হয়। পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি পরবর্তীতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে তৎকালীন কমিশন ও মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে পরবর্তী সময়ের দুদক কমিশন। এছাড়া, বেসিক ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির তৎকালীন পর্ষদকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগও তাঁর কার্যকালের সঙ্গে জড়িত। দুদক ছাড়ার পর বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি, যা রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার পর বড় ধরনের নৈতিক সংকটের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর বৈধতা নিয়ে আইনি লড়াইও কম হয়নি। দুদক আইন অনুযায়ী কমিশনের সাবেক কমিশনারগণ প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিযুক্ত হতে পারেন না—এই যুক্তিতে তাঁর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছিল। যদিও আদালত ও আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেন। তবে তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাঁর পদত্যাগপত্র নিয়ে দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে। প্রথমে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন বলে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেও, পরবর্তীতে এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান যে এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁর পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।
পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নীরবতা পালনের অভিযোগ তোলা হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধীদলীয় সদস্যরা তাঁর ভাষণের সময় ওয়াকআউট করেন এবং তাঁকে অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান। সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে তাঁর কথোপকথনের গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ ছড়ায়। অবশেষে সমস্ত বিতর্ক, আইনি লড়াই এবং জনরোষের মুখে তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন করেই বঙ্গভবন ছাড়তে হলো মো. সাহাবুদ্দিনকে।
রিপোর্টার নাম: 


















