ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়ম এবং মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক ছাত্র বিক্ষোভে নজিরবিহীন সাহসিকতা দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও প্রশংসার জন্ম দিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী মডেল ও থিয়েটারকর্মী রিয়া আহির। শিবাজি পার্কে অনুষ্ঠিত ওই বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ যখন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে জোরপূর্বক আটক করে একটি ভ্যানে তুলছিল, তখন কোনো পরোয়া না করেই সেই ভ্যানের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন রিয়া। তাঁর এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিবাদের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়, যা তাঁকে রাতারাতি দেশজুড়ে পরিচিত এক মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল যখন ভারতের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠেন। শিবাজি পার্কের এই গণবিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান নিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বেশ কয়েকজন ছাত্র ও নারী আন্দোলনকারীকে আটক করে প্রিজন ভ্যানে তোলে। রিয়া আহির গণমাধ্যমকে জানান, ভ্যানের ভেতরে থাকা লোকগুলোর কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। তবে যেভাবে গাদাগাদি করে মানুষগুলোকে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল এবং একজন নারী আন্দোলনকারীকে হেনস্তা করা হচ্ছিল, তা দেখে তিনি নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারেননি। তিনি প্রথমে এক নারীকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হয়ে সরাসরি ভ্যানের চালকের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রিয়া অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুলিশের ভ্যানের ঠিক সামনে অবস্থান করছেন এবং চালক ইঞ্জিন সজোরে চালিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেও তিনি একচুলও নড়েননি। রিয়ার এই অবিচল অবস্থান দেখে মুহূর্তের মধ্যে অন্যান্য বিক্ষোভকারীরাও তাঁর চারপাশে জড়ো হন এবং সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদে শামিল হন। শেষ পর্যন্ত জনরোষ ও শিক্ষার্থীদের দৃঢ়তার মুখে পুলিশ আটক ব্যক্তিদের ঘটনাস্থলেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রিয়া আহিরের এই সাহসিকতার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশে (ITBP) অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও দেশের নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনীতে অবদান রেখেছেন। রিয়া নিজে মনে করেন, এই আপসহীন মনোভাব ও সাহস তাঁর রক্তেই মিশে আছে। মজার ব্যাপার হলো, জীবনের প্রথম কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিয়েই তিনি এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ২১ জুলাই প্রথমবার তিনি শিবাজি পার্কে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ ধরপাকড় শুরু করায় সেদিন আর যোগ দিতে পারেননি। পরদিনই তিনি আবারও উপস্থিত হন এবং ঘটে যায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
শুধু প্রশ্নফাঁস বা একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার অনিয়মই নয়, রিয়ার মতে পুরো ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশার অবসান ঘটা প্রয়োজন। একসময় মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে তা সম্পন্ন করতে পারেননি। বর্তমানে তিনি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহযোগিতার মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ফি পরিশোধ করার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা মেলেনি।
নাট্যমঞ্চ ও ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে রিয়ার রয়েছে দীর্ঘ ১৩ বছরের পথচলা। হিন্দি থিয়েটারে নিয়মিত অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন সফল মডেল ও নারী উদ্যোক্তা। গত বছর তিনি ‘রিয়াসত’ নামের একটি অভিনয় ও শিল্পবান্ধব উদ্যোগ চালু করেন, যার মূল লক্ষ্য স্থানীয় কারুশিল্পীদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্য সরাসরি সাধারণ ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক একটি খ্যাতনামা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের কোলাপুরি চপ্পল নিয়ে নকশা বিতর্কের পর স্থানীয় কারিগরদের মেধা ও শ্রমকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার তাগিদ থেকেই এই উদ্যোগের জন্ম হয়েছিল। সাধারণ একজন মডেল ও শিল্পী থেকে শুরু করে রাজপথে পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া রিয়া আহিরের এই সাহসী ভূমিকা প্রমাণ করে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর আজও ফুরিয়ে যায়নি।
রিপোর্টার নাম: 


















