Hi

০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিশোধের রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশে ন্যায়বিচারের নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার: মাহদী আমিন

বর্তমান সরকার অতীতকালের যেকোনো ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনৈতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থেকে দেশে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস’ (দায়রা) আয়োজিত ‘অ্যাটরোসিটি রিস্ক অ্যান্ড প্রিভেনশন’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

আলোচনায় মাহদী আমিন বলেন, বিগত প্রায় দেড় দশকের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে যে ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার প্রধান শিকার হয়েছিল বিএনপি এবং অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল সবচেয়ে প্রকট। তবে এই দমনপীড়ন শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সরকারের যেকোনো ধরনের গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ও স্বাধীন গোষ্ঠীও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নির্যাতনের মুখে পড়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে নিছক প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বা সংখ্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রতিটি গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একেকটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ও স্থায়ী ক্ষতি ডেকে এনেছে। বহু মানুষ আজও তাদের স্বজনদের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন পর ফিরে এলেও তাদের পরিবারকে চরম সামাজিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গত জুলাইয়ের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোগুলোকে জনকল্যাণমুখী ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার উপযোগী করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা, মানবাধিকারের সর্বজনীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো বাধা না রাখা। সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কার্যক্রম তারই স্পষ্ট প্রতিফলন বলে দাবি করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরাও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে তাঁর বক্তব্যে গুমবিষয়ক প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়াকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত খসড়াটিতে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে আইনটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা বা আইনি প্রশ্ন থেকেই যায়, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে মানবাধিকার কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যকার তদন্তের এখতিয়ার কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের আইন অনুষদের গ্লোবাল একাডেমিক ফেলো সিনথিয়া ফরিদ তাঁর বক্তব্যে গণতান্ত্রিক সুশাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, একটি দেশের গণতান্ত্রিক ধারা কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতর কতটা প্রতিরোধ ও চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স তৈরি হচ্ছে তার ওপর। এর জন্য বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা এবং একটি কার্যকর ও শক্তিশালী সংসদ অপরিহার্য।

অন্যদিকে, নেত্র নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি আকিব মো. শাতিল ২০১০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাদের অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টাইপ-৫৬ রাইফেলের মতো ভারী ও সামরিক গ্রেডের মারণাস্ত্র এবং বিভিন্ন সেমি-অটোমেটিক ও অটোমেটিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যা জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট রিসার্চ ফেলো মোবাশ্বের হাসানের সঞ্চালনায় এই প্যানেল আলোচনাটি দেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এক তাৎপর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।

জনপ্রিয়

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক এমপি গাজী নজরুলের সহযোগী রাকিবুল কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

প্রতিশোধের রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশে ন্যায়বিচারের নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার: মাহদী আমিন

আপডেট : ০৪:১২:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

বর্তমান সরকার অতীতকালের যেকোনো ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনৈতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থেকে দেশে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস’ (দায়রা) আয়োজিত ‘অ্যাটরোসিটি রিস্ক অ্যান্ড প্রিভেনশন’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

আলোচনায় মাহদী আমিন বলেন, বিগত প্রায় দেড় দশকের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে যে ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার প্রধান শিকার হয়েছিল বিএনপি এবং অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল সবচেয়ে প্রকট। তবে এই দমনপীড়ন শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সরকারের যেকোনো ধরনের গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ও স্বাধীন গোষ্ঠীও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নির্যাতনের মুখে পড়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে নিছক প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বা সংখ্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রতিটি গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একেকটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ও স্থায়ী ক্ষতি ডেকে এনেছে। বহু মানুষ আজও তাদের স্বজনদের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন পর ফিরে এলেও তাদের পরিবারকে চরম সামাজিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গত জুলাইয়ের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোগুলোকে জনকল্যাণমুখী ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার উপযোগী করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা, মানবাধিকারের সর্বজনীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো বাধা না রাখা। সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কার্যক্রম তারই স্পষ্ট প্রতিফলন বলে দাবি করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরাও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে তাঁর বক্তব্যে গুমবিষয়ক প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়াকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত খসড়াটিতে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে আইনটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা বা আইনি প্রশ্ন থেকেই যায়, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে মানবাধিকার কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যকার তদন্তের এখতিয়ার কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের আইন অনুষদের গ্লোবাল একাডেমিক ফেলো সিনথিয়া ফরিদ তাঁর বক্তব্যে গণতান্ত্রিক সুশাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, একটি দেশের গণতান্ত্রিক ধারা কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতর কতটা প্রতিরোধ ও চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স তৈরি হচ্ছে তার ওপর। এর জন্য বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা এবং একটি কার্যকর ও শক্তিশালী সংসদ অপরিহার্য।

অন্যদিকে, নেত্র নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি আকিব মো. শাতিল ২০১০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাদের অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টাইপ-৫৬ রাইফেলের মতো ভারী ও সামরিক গ্রেডের মারণাস্ত্র এবং বিভিন্ন সেমি-অটোমেটিক ও অটোমেটিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যা জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট রিসার্চ ফেলো মোবাশ্বের হাসানের সঞ্চালনায় এই প্যানেল আলোচনাটি দেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এক তাৎপর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।