আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে মানুষের জীবনের মানদণ্ড প্রায়শই তার অর্জিত সম্পদ, পদমর্যাদা এবং বিলাসিতার নিরিখে নির্ধারিত হয়। অনেকেই অঢেল বিত্তের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানসিক অস্থিরতা ও অতৃপ্তিতে ভোগেন, আবার এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের পার্থিব সম্বল সামান্য, কিন্তু তাদের জীবনবোধ ও মানসিক প্রশান্তি অত্যন্ত গভীর। এই বৈপরীত্য আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—প্রকৃত ধনী হওয়ার সংজ্ঞা আসলে কী? বস্তুগত সম্পদের প্রাচুর্যই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গূঢ় সত্য?
ইসলামি জীবনদর্শন এবং নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর শিক্ষায় সম্পদের চেয়ে হৃদয়ের সচ্ছলতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারির হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রকৃত ঐশ্বর্য টাকার অংকে পরিমাপযোগ্য নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, যার মনে অতৃপ্তির আগুন জ্বলছে, সে কোটি টাকার মালিক হয়েও দরিদ্র। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি তার প্রাপ্তিতে তুষ্ট, সে জাগতিকভাবে স্বল্প সম্পদের অধিকারী হলেও প্রকৃত অর্থে ধনী। সাহাবি আবু জরের সঙ্গে নবীজির কথোপকথন থেকে এই সত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সম্পদ থাকা বা না থাকা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা মাত্র। সম্পদ অর্জন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, বরং অনেক সাহাবি বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন। পার্থক্যটা ছিল তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে—তারা সম্পদের মালিক ছিলেন, কিন্তু সম্পদ কখনোই তাদের মালিক হতে পারেনি।
বর্তমান অস্থির সময়ে মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার জন্য ‘কোনা’ (Qana’ah) বা অল্পে তুষ্টির গুণটি অত্যন্ত জরুরি। এর অর্থ অলসতা বা প্রচেষ্টা বিমুখতা নয়; বরং সততার সাথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফলাফলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। নিজের অবস্থার সাথে অন্যদের তুলনা করার অভ্যাস মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যখনই কেউ অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখনই সে তার অন্তরের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলে।
মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে সুস্থ থাকতে হলে কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা অপরিহার্য। নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের দিকে তাকালে জীবনের প্রতি এক ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এই বিশ্বাসটুকু মনে গেঁথে নেওয়া প্রয়োজন যে, ঈশ্বর বা আল্লাহ যা বণ্টন করেছেন, তা-ই আমাদের জন্য সর্বোত্তম। যখনই মানুষ পার্থিব মোহের ঊর্ধ্বে উঠে অন্তরের সচ্ছলতাকে মূল সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করতে শিখবে, তখনই সে জীবনের প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তির দেখা পাবে। এই দর্শনের চর্চাই পারে বর্তমান সময়ের ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ উপহার দিতে।
রিপোর্টার নাম: 
























