Hi

১২:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে ফের নূহের নৌকার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০৯:০৭:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৮ জন দেখেছে

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় অবস্থিত দুরুপিনার ফরমেশনে ফের নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এই স্থানটি দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয়ভাবে আলোচিত ‘নূহের নৌকা’র সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের কাজ চলছে, যেখানে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদুলু ও ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য দোগুবায়াজিত এলাকাকে বেছে নেওয়ায় বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে অঞ্চলটির পরিচিতি বাড়বে। এই স্থানটি মূলত তেলচেক গ্রামের নিকটে অবস্থিত এবং আরারাত পর্বতের খুব কাছে। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে ছবি তোলার সময় এই অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনটি প্রথম শনাক্ত করেন। সেই সময় থেকেই জায়গাটি নূহের নৌকার কথিত অবস্থান হিসেবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বর্তমান গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা এবং মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। অনুসন্ধানের শুরুতে গবেষকরা জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে এলাকাটির দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেছেন। এরপর ভূগর্ভস্থ গঠন শনাক্ত করতে বিশেষ রাডার ব্যবহার করা হয়েছে। অধ্যাপক আতিলা জানান, রাডার জরিপে মাটির নিচে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেছে, যা কোনো করিডোর বা কক্ষের মতো দেখায়। এসব কাঠামোর গভীরে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য ড্রিলিং চালানো হচ্ছে।

গবেষকদের পরিকল্পনায় রয়েছে ‘গোফার’ নামক একটি বিশেষ রোবট ব্যবহার করা। এই রোবটটি সরু কোর ড্রিলের মাধ্যমে মাটির গভীরে প্রবেশ করে উচ্চ রেজল্যুশনের ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম। এছাড়া এটি মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজও করবে। তবে এখন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ এই কাঠামোকে নূহের নৌকার অংশ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায়নি।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স দাবি করেছেন, এই মাটির ঢিবির ভেতরের ও বাইরের অংশে জৈব পদার্থ ও রাসায়নিক উপাদানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তাঁর তথ্যমতে, বাইরের তুলনায় ভেতরের মাটিতে প্রায় তিনগুণ বেশি জৈব পদার্থ বিদ্যমান। এছাড়া ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রায় প্রায় আটগুণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের পচনের ফলে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে, যদিও এটি নূহের নৌকার অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়।

দুরুপিনার ফরমেশনকে নিয়ে এর আগেও অনেকবার বিতর্ক হয়েছে। ১৯৯৬ সালের এক গবেষণায় এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অনেক ভূতাত্ত্বিক মনে করেন, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সংমিশ্রণে গঠিত এই এলাকাটি প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণেই নৌকার মতো আকৃতি ধারণ করেছে। এছাড়া মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ড গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করে এলাকাটি পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৪ মিটার পরিমাপ করেছিলেন, যা ধর্মীয় বর্ণনায় নূহের নৌকার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। ৩৪০০০ ফুট উঁচুতে এক পাইলট ছুরিকাঘাত করেন আরেকজনকে, ১৮০ যাত্রীসহ বিমান ক্র্যাশ করার চেষ্টা।

ফরমেশনের আশেপাশে থাকা বড় পাথরগুলো নিয়েও নানা মত রয়েছে। কেউ কেউ এগুলোকে প্রাচীন নৌকার নোঙর বলে দাবি করলেও, সংশয়বাদীরা এগুলোকে সমাধির স্মৃতিচিহ্ন মনে করেন। জানা গেছে, ফ্যাসোল্ড নিজেও একপর্যায়ে নূহের নৌকার তত্ত্ব থেকে সরে এসেছিলেন।

অধ্যাপক আতিলা জানিয়েছেন, সংগৃহীত নমুনাগুলোর পরীক্ষা শীতকালজুড়ে চলবে এবং কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ কিছুটা দীর্ঘায়িত হতে পারে, তাই আগামী বছরগুলোতেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নূহের নৌকা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম— এই তিন ধর্মেই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুরুপিনার ফরমেশনটি আসলেই নৌকার অংশ বলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে স্থানটি বিশ্বজুড়ে পর্যটনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তবে আপাতত এটি কেবল একটি গবেষণামূলক প্রচেষ্টা হিসেবেই চলছে। শীতের কারণে পাহাড়ি এলাকায় গবেষণা কার্যক্রমে বিরতি পড়তে পারে।

জনপ্রিয়
© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে ফের নূহের নৌকার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

আপডেট : ০৯:০৭:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় অবস্থিত দুরুপিনার ফরমেশনে ফের নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এই স্থানটি দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয়ভাবে আলোচিত ‘নূহের নৌকা’র সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের কাজ চলছে, যেখানে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদুলু ও ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য দোগুবায়াজিত এলাকাকে বেছে নেওয়ায় বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে অঞ্চলটির পরিচিতি বাড়বে। এই স্থানটি মূলত তেলচেক গ্রামের নিকটে অবস্থিত এবং আরারাত পর্বতের খুব কাছে। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে ছবি তোলার সময় এই অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনটি প্রথম শনাক্ত করেন। সেই সময় থেকেই জায়গাটি নূহের নৌকার কথিত অবস্থান হিসেবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বর্তমান গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা এবং মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। অনুসন্ধানের শুরুতে গবেষকরা জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে এলাকাটির দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেছেন। এরপর ভূগর্ভস্থ গঠন শনাক্ত করতে বিশেষ রাডার ব্যবহার করা হয়েছে। অধ্যাপক আতিলা জানান, রাডার জরিপে মাটির নিচে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেছে, যা কোনো করিডোর বা কক্ষের মতো দেখায়। এসব কাঠামোর গভীরে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য ড্রিলিং চালানো হচ্ছে।

গবেষকদের পরিকল্পনায় রয়েছে ‘গোফার’ নামক একটি বিশেষ রোবট ব্যবহার করা। এই রোবটটি সরু কোর ড্রিলের মাধ্যমে মাটির গভীরে প্রবেশ করে উচ্চ রেজল্যুশনের ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম। এছাড়া এটি মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজও করবে। তবে এখন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ এই কাঠামোকে নূহের নৌকার অংশ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায়নি।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স দাবি করেছেন, এই মাটির ঢিবির ভেতরের ও বাইরের অংশে জৈব পদার্থ ও রাসায়নিক উপাদানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তাঁর তথ্যমতে, বাইরের তুলনায় ভেতরের মাটিতে প্রায় তিনগুণ বেশি জৈব পদার্থ বিদ্যমান। এছাড়া ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রায় প্রায় আটগুণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের পচনের ফলে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে, যদিও এটি নূহের নৌকার অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়।

দুরুপিনার ফরমেশনকে নিয়ে এর আগেও অনেকবার বিতর্ক হয়েছে। ১৯৯৬ সালের এক গবেষণায় এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অনেক ভূতাত্ত্বিক মনে করেন, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সংমিশ্রণে গঠিত এই এলাকাটি প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণেই নৌকার মতো আকৃতি ধারণ করেছে। এছাড়া মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ড গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করে এলাকাটি পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৪ মিটার পরিমাপ করেছিলেন, যা ধর্মীয় বর্ণনায় নূহের নৌকার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। ৩৪০০০ ফুট উঁচুতে এক পাইলট ছুরিকাঘাত করেন আরেকজনকে, ১৮০ যাত্রীসহ বিমান ক্র্যাশ করার চেষ্টা।

ফরমেশনের আশেপাশে থাকা বড় পাথরগুলো নিয়েও নানা মত রয়েছে। কেউ কেউ এগুলোকে প্রাচীন নৌকার নোঙর বলে দাবি করলেও, সংশয়বাদীরা এগুলোকে সমাধির স্মৃতিচিহ্ন মনে করেন। জানা গেছে, ফ্যাসোল্ড নিজেও একপর্যায়ে নূহের নৌকার তত্ত্ব থেকে সরে এসেছিলেন।

অধ্যাপক আতিলা জানিয়েছেন, সংগৃহীত নমুনাগুলোর পরীক্ষা শীতকালজুড়ে চলবে এবং কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ কিছুটা দীর্ঘায়িত হতে পারে, তাই আগামী বছরগুলোতেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নূহের নৌকা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম— এই তিন ধর্মেই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুরুপিনার ফরমেশনটি আসলেই নৌকার অংশ বলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে স্থানটি বিশ্বজুড়ে পর্যটনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তবে আপাতত এটি কেবল একটি গবেষণামূলক প্রচেষ্টা হিসেবেই চলছে। শীতের কারণে পাহাড়ি এলাকায় গবেষণা কার্যক্রমে বিরতি পড়তে পারে।