Hi

০৭:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন: কেবল সংস্কারই কি যথেষ্ট?

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি এখন জনমানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন কমিশন গঠন ও জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বা কাগুজে পরিবর্তনের মাধ্যমেই কি দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক সংকট সমাধান সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়েও জরুরি হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে দলীয় আনুগত্য, ভয়ের রাজনীতি এবং প্রতিহিংসার চিত্রই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী দলের বয়ানই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। ফলে মেধার চেয়ে দলীয় পরিচয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া—সর্বত্রই এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ছাপ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের মনে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দলীয় পরিচয় বা লবিং ছাড়া রাষ্ট্র থেকে কোনো সুবিধা পাওয়া অসম্ভব। এই সংস্কৃতি শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা নাগরিক অভ্যাসের সংকটে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার পরিবর্তে সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে উঠবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে সফল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আসে বিজয়ীদের উদারতা এবং পরাজিতদের নিরাপত্তাবোধের সমন্বয়ে। সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্রিয়া। আইন পরিবর্তন করা সহজ হলেও, সেই আইন মানার মানসিকতা, ভিন্নমত সহ্য করার সক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থান তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সরানো সম্ভব হলেও, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের দুষ্টচক্র থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী, কারণ তারা দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। তাই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে একটি গণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকীর মতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতার চর্চাই পারে এই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। পরিশেষে, রাষ্ট্র সংস্কারের এই যাত্রায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের ধৈর্য—উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল আইন বা কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়ার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে পারলেই প্রকৃত অর্থে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

জনপ্রিয়

পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়ন: শিক্ষক-কর্মচারীদের সম্মানি বাড়াল সরকার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন: কেবল সংস্কারই কি যথেষ্ট?

আপডেট : ০৩:৪৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি এখন জনমানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন কমিশন গঠন ও জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বা কাগুজে পরিবর্তনের মাধ্যমেই কি দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক সংকট সমাধান সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়েও জরুরি হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে দলীয় আনুগত্য, ভয়ের রাজনীতি এবং প্রতিহিংসার চিত্রই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী দলের বয়ানই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। ফলে মেধার চেয়ে দলীয় পরিচয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া—সর্বত্রই এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ছাপ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের মনে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দলীয় পরিচয় বা লবিং ছাড়া রাষ্ট্র থেকে কোনো সুবিধা পাওয়া অসম্ভব। এই সংস্কৃতি শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা নাগরিক অভ্যাসের সংকটে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার পরিবর্তে সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে উঠবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে সফল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আসে বিজয়ীদের উদারতা এবং পরাজিতদের নিরাপত্তাবোধের সমন্বয়ে। সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্রিয়া। আইন পরিবর্তন করা সহজ হলেও, সেই আইন মানার মানসিকতা, ভিন্নমত সহ্য করার সক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থান তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সরানো সম্ভব হলেও, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের দুষ্টচক্র থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী, কারণ তারা দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। তাই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে একটি গণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকীর মতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতার চর্চাই পারে এই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। পরিশেষে, রাষ্ট্র সংস্কারের এই যাত্রায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের ধৈর্য—উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল আইন বা কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়ার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে পারলেই প্রকৃত অর্থে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।