ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন দেশটির প্রধান চারটি বিরোধী দলের নেতারা। গত মঙ্গলবার হার্জলিয়ায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে জোট গঠন এবং নতুন নেসেট বা পার্লামেন্টের শপথ গ্রহণের আগেই সংসদীয় কৌশলের সমন্বয় সাধনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে এই জোট গঠনের পথ মোটেই সহজ নয়, কারণ গাণিতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হার্জলিয়ায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা দ্রুত জোট আলোচনা শুরু এবং আগামী সপ্তাহে নতুন নেসেটের (ইসরাইলের পার্লামেন্ট) শপথের আগে সংসদীয় কৌশল সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ভবিষ্যৎ জোট সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। তবে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে হারেদি দলগুলোর সরকারে অংশগ্রহণের বিষয়ে আগের মতো দৃঢ় বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেননি তিনি।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে বিরোধী চারটি দলের মোট আসন সংখ্যা ৪৮, যেখানে নেতানিয়াহুর জোটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৫৩টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুর সংখ্যাতত্ত্ব পেতে বিরোধীদের ১৯টি আসন পাওয়া দুটি আরব দলের সমর্থনের প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বিরোধী শিবিরে মতপার্থক্য রয়েছে, কারণ অধিকাংশ ইহুদি বিরোধী দলই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গড়তে আগ্রহী নয়। অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও বিরোধীদের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছেন নেতানিয়াহু।
হার্জলিয়ার বৈঠকে ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান এবং ইসরাইল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করেছে, নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরানো প্রয়োজন।
বৈঠকে আইজেনকটের প্রস্তাবিত চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে নতুন সরকার পরিচালনার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইসরাইলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা, দেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলা, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা নিশ্চিত করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সামরিক সক্ষমতা ও শাসন ব্যবস্থার বিলোপ ঘটানো। এতে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা থেকে অতি-অর্থোডক্সদের অব্যাহতি দেওয়ার বিরোধিতা করে প্রচারণা চালালেও তাদের জোটে নেওয়ার বিষয়ে তার অবস্থান কিছুটা নমনীয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৎকালীন বিদায়ী নেসেটের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে বিরোধী নেতারা প্রথমেই লিকুদ দলের আমির ওহানাকে স্পিকারের পদ থেকে অপসারণের উদ্যোগ নিতে পারেন। এই পদক্ষেপটি সফল হলে নেতানিয়াহুর বাধার মুখে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাসের সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের হামলার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বৈঠকে ওহানার স্থলে লাপিদকে স্পিকার হিসেবে বসানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দলগুলোর নেতারা ঐক্যবদ্ধ এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর গঠিত সরকারকে সরিয়ে জাতীয় জরুরি সরকার প্রতিষ্ঠায় দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে ওহানাকে সরিয়ে লাপিদকে স্পিকার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন তারা। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে এমন সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে লিকুদ।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে সরকার গঠনের প্রাথমিক সুযোগ হিসেবে গাদি আইজেনকটের নাম প্রস্তাব করার বিষয়েও বিরোধী নেতারা একমত হয়েছেন। দলগুলো তাদের আলোচক দলকে অবিলম্বে নীতিগত নির্দেশিকা তৈরির কাজে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিরোধী নেতারা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টির প্রচারণাকে ‘বিপজ্জনক ও উন্মত্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফলে নতুন সরকার গঠনের পথ এখনো অনিশ্চিত। নেসেটে থাকা স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগানোর কথাও উল্লেখ করা হয়। তাদের ভাষায়, এটি একটি ‘বিপজ্জনক ও উন্মত্ত প্রচারণা’। বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে ইয়ার লাপিদ বলেন, নির্বাচনের ফলকে দুর্বল করার গুরুতর ও বিপজ্জনক চেষ্টা চলছে।
এদিকে লিকুদ পার্টির পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এই জোট গঠন প্রচেষ্টাকে ‘সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের ওপর নির্ভরশীল’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
লিকুদ দাবি করেছে, সম্ভাব্য এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সদস্য হামাস ও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক।
এমনকি বিদেশি শক্তির সহায়তায় নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগও তুলেছে তারা, যদিও এর পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। নির্বাচন তদারকির দায়িত্বে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোআম সোলবার্গ নির্বাচনের ফল অনুমোদনের প্রক্রিয়া স্থগিত করার দাবিও নাকচ করে দিয়েছেন।
নাফতালি বেনেট জানিয়েছেন, আইজেনকটের নেতৃত্বে একটি ‘জাতীয় পুনর্গঠনমূলক জায়নবাদী সরকার’ গঠনের জন্য তার দল পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাজ করবে। অন্যদিকে, ইয়ার গোলান এরই মধ্যে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন ও আহমেদ তিবির সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে কথা বলা একমাত্র ইহুদি বিরোধী নেতা। যদিও আভিগদর লিবারম্যানসহ অন্যান্য বিরোধী নেতা এখনও এ বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছেন। তবে লিবারম্যান জানিয়েছেন, তিনি আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই সরকার গঠনের একটি স্থিতিশীল উপায় খুঁজছেন। এ ক্ষেত্রে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দলের দিকে ইঙ্গিত করেছে তারা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে সরকারের ব্যর্থতার দায় নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রতি বিরোধী নেতাদের অনাস্থা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি পক্ষই নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
রিপোর্টার নাম: 
























