জীবনের সায়াহ্নে এসে নিজের অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের চরম মাসুল গুনছেন ৮৫ বছর বয়সী হাজী শামসুল হক মোল্লা।
একসময় জমিজমা বিক্রি করে চার মেয়েকে অর্থ দিলেও দুই ছেলেকে করেছিলেন পুরোপুরি বঞ্চিত। নিজে সঞ্চিত অর্থও দান, ধার ও নানা খাতে খরচ করে শেষ পর্যন্ত হয়েছেন নিঃস্ব। এখন অসুস্থ শরীরে যখন স্বজনদের সান্নিধ্য ও আশ্রয় প্রয়োজন, তখনই জীবনের বড় ভুলটি বুঝতে পারছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামসুল হক বলেন, আমি ভুল করেছি। সন্তানদের ঠকিয়েছি এবং তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছি। আমার মতো ভুল যেন আর কোনো বাবা না করেন। সন্তানদের নিঃস্ব করে নিজে খামখেয়ালি করা বোকামি। জীবনের শেষ কটা দিন আমি পরিবারের সঙ্গে থাকতে চাই। নিজের কাছে থাকা টাকা থেকে কাউকে ধার দিয়েছেন, কিছু অর্থ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরণ গ্রামে গত বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে এই বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। সম্প্রতি বাড়ির পাশের একটি গাছতলায় তাঁর অবস্থানের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকা জুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও গ্রামবাসীর মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত দুই ছেলের বাড়িতে ফিরে গেছেন তিনি। যদিও শামসুল হকের দাবি, কোনো মেয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেননি। বরং নিজের অভিমান ও সংকোচের কারণে বড় মেয়ে ও ছেলেদের বাড়িতে উঠতে পারেননি তিনি। সম্পত্তি বণ্টনের প্রভাব পড়েছে দুই ছেলের জীবনেও।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে নিজের জমিজমা বিক্রি করে চার মেয়েকে টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা নিজের কাছে রেখেছিলেন শামসুল হক। পরে অসুস্থ হয়ে সৌদি আরবে ওমরাহ পালনে গিয়েও চিকিৎসা খরচ ও নানামুখী ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে তাঁর জমানো টাকা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এছাড়া, প্রায় ২০ বছর আগে বড় ছেলে আজিজুলের মেয়ের নামে পাঁচ কাঠা জমি লিখে দিলেও, পরে সেই জমি ছোট ছেলে রিয়াজুল কিনে নেন। বড় ছেলে আজিজুল নিজের নামে কোনো জমি না কিনতে পারায় এখন বাড়িতে ফিরে ছোট ভাইয়ের ঘরেই থাকছেন। তবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ওমরাহ সম্পন্ন না করেই দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। দেশে ফিরে কখনো মেয়েদের বাড়িতে, কখনো মসজিদ-মাদরাসায় সময় কাটিয়েছেন। বর্তমানে বাড়িতে এলে ছোট ভাইয়ের বাড়িতেই থাকেন। তাঁর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি সেই টাকা দিতে অনীহা প্রকাশ করি।
বড় ছেলে আজিজুল জানান, বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন তাদের যোগাযোগ ছিল না। তিনি আমাদের হক থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। বোনদের টাকা দিলেও আমাদের কোনো জায়গা কেনার সুযোগ দেননি। তবে এত কিছুর পরও বাবাকে অবহেলায় ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়; আমরা চেষ্টা করব শেষ বয়সে তাঁকে ভালো রাখতে। বড় মেয়ে মায়া বেগম জানান, বাবার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ে বিরোধ থাকলেও তাঁকে আশ্রয়হীন করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে গচ্ছিত টাকা ফেরত চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধের পর বাবা থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হন এবং টাকা নিয়ে চলে যান। তাঁর ভাষায়, ‘আমাকে রাস্তায় ফেলে যায়নি আমার মেয়ে। তবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন। সংবাদ দেখে ইউএনও সাহেব আমাদের এলাকায় আসেন। একই সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলেও অসুস্থ ও অসহায় মা-বাবার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব ও মানবিকতা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এর আগে ছোট মেয়ে কাজুলী বেগমের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভাবের সংসার আর অসুস্থ বাবার সেবা করা কাজুলীর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। গত সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে সেজো মেয়ে সালমা বেগমের বাসা থেকে নিজ গ্রাম উত্তর হিরণে ফিরে দুই রাত মসজিদে কাটিয়েছিলেন শামসুল হক। বিষয়টি জানাজানি হলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন উত্তর হিরণ গ্রামে গিয়ে দুই ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন উত্তর হিরণ গ্রামে গিয়ে শামসুল হকের দুই ছেলের সঙ্গে কথা বলেন।
ইউএনও সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। অসুস্থ বাবার নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে ছেলেদের অনুরোধ জানান এবং পারিবারিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক হওয়ার পরামর্শ দেন। প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান মৃধা বলেন, জমি বিক্রির অনেক আগে থেকেই তিনি আলাদা থাকতেন। সম্পত্তির অধিকার থেকে সন্তানদের বঞ্চিত করার এই পরিণাম সমাজের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
শামসুল হকের ভাতিজা জামাল মোল্লা দাবি করেন, ঘটনার প্রকৃত বাস্তবতা না জেনেই অনেক গণমাধ্যম একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। ছোট ছেলে রিয়াজুলের স্ত্রী হাফিজা বেগম জানান, বাবা চলাফেরা করতে পারেন না। আমাদের দরিদ্র সংসারে চিকিৎসার খরচ জোগানো কষ্টকর হলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাঁকে রাখতে। এই ঘটনা সম্পত্তি বণ্টন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বার্ধক্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তার অবকাশ তৈরি করেছে। জীবন সায়াহ্নে সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং দূরদর্শিতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা ঢাকায় বসবাস করেন।
রিপোর্টার নাম: 

























