Hi

১২:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলেপল্লির সেই ছেলে যখন সাহিত্যের প্রদীপ জ্বালান

চট্টগ্রামের পতেঙ্গার এক জেলেপল্লিতে ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর জন্ম নেওয়া হরিশংকর জলদাস আজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত মুখ। ‘জলপুত্র’, ‘দহনকাল’ ও ‘নোনাজলে ডুবসাঁতার’-এর মতো উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি জেলেজীবনের দুঃখ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কীর্তিমান লেখক আজ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিতে। জেলেপল্লিতে আমাদের বাড়ির পশ্চিমে সমুদ্র। হরিশংকর জলদাস: আমরা ছিলাম ছয় ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবার। তখন আমরা বইঠা বাওয়া নৌকায় সাগরের দুই–তিন কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলে মাছ ধরতাম। আমাদের পুকুরপাড়ে এমনিতেই কলমি আর হেলেঞ্চার শাক হতো।

নিজের শৈশব ও পড়াশোনার সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে হরিশংকর জলদাস স্মৃতিচারণ করেন। জেলেপল্লিতে পড়াশোনা করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক লড়াই। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। নিজের বাবার অকালমৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরা মা পরানেশ্বরীর কষ্টের কথা মনে পড়ে লেখকের। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিধবা হওয়া ঠাকুরমার সংগ্রামী জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাবা চাইতেন না সন্তানরা সমুদ্রে যাক, তাই তাঁর জেদেই আমি স্কুলে পড়াশোনা করতে পারি। লেখাপড়া করতে গিয়ে কি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। টেকনাফ থেকে হাতিয়া পর্যন্ত জেলেসমাজের কোথাও পড়াশোনা জানা লোক ছিলেন না। সমুদ্রের প্রতি তাঁর ভীষণ রাগ জন্মায়। অনেক জেলে পরিবারে ১৭টি ছেলেমেয়েও ছিল। বাবা সাগরে ছেলেদের নেবেন না ঠিক করলেও ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনিও আট সন্তানের পিতা হলেন। মনে আছে, ক্লাস ফাইভে রেজাল্ট দেওয়ার দিন ঠাকুরদি মাছের ঝাঁকা নিয়ে স্কুলে হাজির হয়েছিলেন। একটা গাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে তিনি দেখছিলেন, হেডমাস্টার রেজাল্ট ঘোষণা করছেন। সেদিন এ কথা শুনে মনে হলো আমাকে পড়তেই হবে। জীবনের বহু বছর পর্যন্ত পেট ভরে ভাত খাওয়ার যে স্বস্তি, তা অনুভব করতে পারিনি।

পরিবারের আট ভাইবোনের বড় সংসারে ১১ জন সদস্যের অন্ন জোগাতে হিমশিম খেতে হতো। হরিশংকর জলদাস বলেন, ১১-১২ বছর বয়স থেকেই সংসারের প্রয়োজনে মাছ ধরতে সাগরে যেতে শুরু করি। সেই সময়ে জেলেপল্লিতে মাছ ধরাকেই একমাত্র জীবনধারা হিসেবে দেখা হতো। তিনি জানান, ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে জেলেপল্লিতে সন্তানদের বেশি নেওয়ার প্রবণতা ছিল কেবল মাছ ধরার শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। স্কুলে প্রথম হওয়ার দিনেও ঠাকুরমার মাছের ঝাঁকা নিয়ে উপস্থিত থাকা এবং মানুষের অবজ্ঞাসূচক কথা তাঁকে পড়াশোনায় অটল থাকতে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেখানে আপনিই সম্ভবত স্কুলে পড়া প্রথম শিশু। বাবার যখন আড়াই বছর বয়স, তখন দাদা চন্দ্রমণি জলদাস মাছ ধরতে সাগরে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে মারা যান। পতেঙ্গার যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে বেশির ভাগই ছিল হিন্দুপাড়ার ছাত্রছাত্রী। হরিশংকর জলদাস: আগেই বলেছি, সংসারে ১১ জন সদস্য। ওই বয়স্ক ব্যক্তিটি সে বিবরণ দিতে গিয়ে বললেন, ‘আঁরার এলাকার ১০ জন মানুষ আর ৩ জন ডোম মারা গিইয়ে। এটাই আমাকে আরও পড়তে, আরও সামনে যেতে সাহায্য করেছে। আপনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, গবেষণা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, পরে অধ্যাপনাও করেছেন।

অধ্যাপনা জীবনেও নিজের অতীত ভোলেননি তিনি। ১৯৭৪-৭৫ সালের চরম খাদ্যসংকটের সময় শিক্ষকতা করেও পরিবারের ১১ সদস্যের খাবার নিশ্চিত করতে তাঁকে সারা রাত মাছ ধরতে হয়েছে। তিনি বলেন, মাছ ধরার পর স্নান সেরে সরাসরি কলেজে ক্লাস নিতে যেতাম। এমন কষ্টের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাহিত্যের পথ দেখায়। গবেষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, বাংলা সাহিত্যে জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা অধিকাংশ কাজই প্রকৃত বাস্তব চিত্র থেকে দূরে। এই গ্লানি ও অপমানই তাঁকে নিজের জীবন থেকে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আপনি শিক্ষকতা করার সময়েও রাতে নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন।

সাহিত্যিক সাফল্যের পরেও তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেন। নিজের আত্মকথামূলক উপন্যাসে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন স্মৃতি ও নিপীড়নের কথা অকপটে লিখেছেন। বর্তমানে জেলেপল্লির তরুণরা তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও বয়স্ক মানুষজন এখনো সহজভাবে মেশেন।

মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষ একেকটা মাটির প্রদীপ। সবার মধ্যেই প্রতিভা বা সলতে থাকে, কিন্তু তা জ্বলে ওঠার জন্য অনুপ্রেরণা ও সুযোগ প্রয়োজন। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস সেই সলতেতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন বলেই আজ তাঁরা ভাইবোনেরা সফল হতে পেরেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তবে প্রান্তিক মানুষও প্রতিকূলতা পেরিয়ে আলোর পথে আসতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তখনই এক অভিভাবক বলে উঠলেন, ‘জাইল্লার ফোয়া কেনে ফাস্ট ওইয়ে।

জেলেপল্লির সেই ছেলে যখন সাহিত্যের প্রদীপ জ্বালান

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

জেলেপল্লির সেই ছেলে যখন সাহিত্যের প্রদীপ জ্বালান

আপডেট : ১২:০১:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের পতেঙ্গার এক জেলেপল্লিতে ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর জন্ম নেওয়া হরিশংকর জলদাস আজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত মুখ। ‘জলপুত্র’, ‘দহনকাল’ ও ‘নোনাজলে ডুবসাঁতার’-এর মতো উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি জেলেজীবনের দুঃখ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কীর্তিমান লেখক আজ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিতে। জেলেপল্লিতে আমাদের বাড়ির পশ্চিমে সমুদ্র। হরিশংকর জলদাস: আমরা ছিলাম ছয় ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবার। তখন আমরা বইঠা বাওয়া নৌকায় সাগরের দুই–তিন কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলে মাছ ধরতাম। আমাদের পুকুরপাড়ে এমনিতেই কলমি আর হেলেঞ্চার শাক হতো।

নিজের শৈশব ও পড়াশোনার সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে হরিশংকর জলদাস স্মৃতিচারণ করেন। জেলেপল্লিতে পড়াশোনা করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক লড়াই। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। নিজের বাবার অকালমৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরা মা পরানেশ্বরীর কষ্টের কথা মনে পড়ে লেখকের। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিধবা হওয়া ঠাকুরমার সংগ্রামী জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাবা চাইতেন না সন্তানরা সমুদ্রে যাক, তাই তাঁর জেদেই আমি স্কুলে পড়াশোনা করতে পারি। লেখাপড়া করতে গিয়ে কি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। টেকনাফ থেকে হাতিয়া পর্যন্ত জেলেসমাজের কোথাও পড়াশোনা জানা লোক ছিলেন না। সমুদ্রের প্রতি তাঁর ভীষণ রাগ জন্মায়। অনেক জেলে পরিবারে ১৭টি ছেলেমেয়েও ছিল। বাবা সাগরে ছেলেদের নেবেন না ঠিক করলেও ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনিও আট সন্তানের পিতা হলেন। মনে আছে, ক্লাস ফাইভে রেজাল্ট দেওয়ার দিন ঠাকুরদি মাছের ঝাঁকা নিয়ে স্কুলে হাজির হয়েছিলেন। একটা গাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে তিনি দেখছিলেন, হেডমাস্টার রেজাল্ট ঘোষণা করছেন। সেদিন এ কথা শুনে মনে হলো আমাকে পড়তেই হবে। জীবনের বহু বছর পর্যন্ত পেট ভরে ভাত খাওয়ার যে স্বস্তি, তা অনুভব করতে পারিনি।

পরিবারের আট ভাইবোনের বড় সংসারে ১১ জন সদস্যের অন্ন জোগাতে হিমশিম খেতে হতো। হরিশংকর জলদাস বলেন, ১১-১২ বছর বয়স থেকেই সংসারের প্রয়োজনে মাছ ধরতে সাগরে যেতে শুরু করি। সেই সময়ে জেলেপল্লিতে মাছ ধরাকেই একমাত্র জীবনধারা হিসেবে দেখা হতো। তিনি জানান, ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে জেলেপল্লিতে সন্তানদের বেশি নেওয়ার প্রবণতা ছিল কেবল মাছ ধরার শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। স্কুলে প্রথম হওয়ার দিনেও ঠাকুরমার মাছের ঝাঁকা নিয়ে উপস্থিত থাকা এবং মানুষের অবজ্ঞাসূচক কথা তাঁকে পড়াশোনায় অটল থাকতে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেখানে আপনিই সম্ভবত স্কুলে পড়া প্রথম শিশু। বাবার যখন আড়াই বছর বয়স, তখন দাদা চন্দ্রমণি জলদাস মাছ ধরতে সাগরে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে মারা যান। পতেঙ্গার যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে বেশির ভাগই ছিল হিন্দুপাড়ার ছাত্রছাত্রী। হরিশংকর জলদাস: আগেই বলেছি, সংসারে ১১ জন সদস্য। ওই বয়স্ক ব্যক্তিটি সে বিবরণ দিতে গিয়ে বললেন, ‘আঁরার এলাকার ১০ জন মানুষ আর ৩ জন ডোম মারা গিইয়ে। এটাই আমাকে আরও পড়তে, আরও সামনে যেতে সাহায্য করেছে। আপনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, গবেষণা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, পরে অধ্যাপনাও করেছেন।

অধ্যাপনা জীবনেও নিজের অতীত ভোলেননি তিনি। ১৯৭৪-৭৫ সালের চরম খাদ্যসংকটের সময় শিক্ষকতা করেও পরিবারের ১১ সদস্যের খাবার নিশ্চিত করতে তাঁকে সারা রাত মাছ ধরতে হয়েছে। তিনি বলেন, মাছ ধরার পর স্নান সেরে সরাসরি কলেজে ক্লাস নিতে যেতাম। এমন কষ্টের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাহিত্যের পথ দেখায়। গবেষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, বাংলা সাহিত্যে জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা অধিকাংশ কাজই প্রকৃত বাস্তব চিত্র থেকে দূরে। এই গ্লানি ও অপমানই তাঁকে নিজের জীবন থেকে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আপনি শিক্ষকতা করার সময়েও রাতে নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন।

সাহিত্যিক সাফল্যের পরেও তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেন। নিজের আত্মকথামূলক উপন্যাসে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন স্মৃতি ও নিপীড়নের কথা অকপটে লিখেছেন। বর্তমানে জেলেপল্লির তরুণরা তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও বয়স্ক মানুষজন এখনো সহজভাবে মেশেন।

মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষ একেকটা মাটির প্রদীপ। সবার মধ্যেই প্রতিভা বা সলতে থাকে, কিন্তু তা জ্বলে ওঠার জন্য অনুপ্রেরণা ও সুযোগ প্রয়োজন। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস সেই সলতেতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন বলেই আজ তাঁরা ভাইবোনেরা সফল হতে পেরেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তবে প্রান্তিক মানুষও প্রতিকূলতা পেরিয়ে আলোর পথে আসতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তখনই এক অভিভাবক বলে উঠলেন, ‘জাইল্লার ফোয়া কেনে ফাস্ট ওইয়ে।