Hi

০৫:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতবর্ষে গ্রেটা গার্বোর ‘দ্য টেম্পট্রেস’: এক সিনেমার দুই সমাপ্তি

পর্দায় এক তরুণীর মুখচ্ছবি। কখনো রহস্যে মোড়া, কখনো বিষণ্ন, আবার কখনো অদম্য আকর্ষণে ভরপুর। সংলাপহীন সেই যুগে শুধুমাত্র চোখের চাহনি ও শারীরিক অভিব্যক্তি দিয়ে দর্শককে সম্মোহিত করে রেখেছিলেন গ্রেটা গার্বো। ১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য টেম্পট্রেস’ সিনেমাটি সেই সময়ের গার্বোর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের নথিপত্র অনুযায়ী, আজ ছবিটির মুক্তির ১০০ বছর পূর্ণ হলো। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এই কালজয়ী অভিনেত্রীর শুরুর দিকের কাজগুলো আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। কখনো রহস্যময়, কখনো বিষণ্ন, কখনো আবার এমন আকর্ষণীয় যে চোখ ফেরানো কঠিন। কোনো সংলাপ নেই, কণ্ঠস্বর শোনারও সুযোগ নেই। শুধু চোখ–মুখের অভিব্যক্তি আর শরীরী ভাষা দিয়েই দর্শককে আটকে রাখছেন তিনি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি যে হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন, সেই গল্প তখনো লেখা হয়নি। উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ পরের বছর ‘দ্য টেম্পট্রেস’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক ভিসেন্তে ব্লাসকো ইবানিয়েসের ১৯২২ সালের উপন্যাস ‘লা তিয়েরা দে তোদোস’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল ‘দ্য টেম্পট্রেস’। এটি ছিল হলিউডে গার্বোর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র; এর আগে তিনি ‘দ্য টরেন্ট’-এর মাধ্যমে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। ছবিটির শুটিং শুরুর সময় গার্বোর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ সালে জন্ম নেওয়া এই তারকা যখন পর্দা কাঁপিয়ে মুক্তি পেলেন, তখন তাঁর বয়স সদ্য ২১ বছর। মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) প্রযোজিত এই ছবিটির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন টনি গাউদিও ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলস, যাঁরা গার্বোর পর্দায় উপস্থিতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সুইডেন থেকে আসা তরুণীকে নিয়ে হলিউডের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের (এমজিএম) আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গার্বোর হলিউডে তারকা হয়ে ওঠার শুরুর দিন, তাঁর গুরু মরিত্জ স্টিলারের সঙ্গে এমজিএমের সংঘাত, শুটিং শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই পরিচালক বদল এবং স্টুডিও-নিয়ন্ত্রিত হলিউডের এক অন্য রকম অধ্যায়। প্রযোজনা-সংযোগে ছিল এমজিএম, পরিবেশনার দায়িত্বেও ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

পর্দার বাইরের গল্পটিও ছিল বেশ ঘটনাবহুল। ছবিটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মরিত্জ স্টিলার, যিনি সুইডেনে থাকতেই গার্বোর প্রতিভা প্রথম শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ৩ এপ্রিল ১৯২৬ তারিখে শুটিং শুরুর ঠিক এক মাস পরেই ছন্দপতন ঘটে। এমজিএম কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মরিত্জ স্টিলারকে সরিয়ে ফ্রেড নিবলোকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকার ৫ মে ১৯২৬ সংখ্যায় এই রদবদলের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের গুরুর প্রতি স্টুডিওর এমন অবিচার গার্বোকে দারুণভাবে আহত করেছিল; এমনকি তিনি হলিউড ছেড়ে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। শেষ পর্যন্ত রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁর ক্যারিয়ারকে নতুন পথে চালিত করে।

‘দ্য টেম্পট্রেস’ নিয়ে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো এর দুটি ভিন্ন সমাপ্তি। মূল গল্পে একটি বিষাদময় সমাপ্তি ছিল যেখানে এলেনার করুণ পরিণতি দেখানো হয়। তবে এমজিএমপ্রধান লুই বি মেয়ারের নির্দেশে দর্শকদের জন্য একটি সুখের সমাপ্তিও চিত্রায়িত করা হয়েছিল। নির্বাক চলচ্চিত্র সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘সাইলেন্ট এরা’র নথিতে দেখা যায়, মূল নেগেটিভ প্রিন্টের পাশাপাশি এই বিকল্প সমাপ্তিও সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯২৬ সালের ২৩ অক্টোবর ‘মোশন পিকচার নিউজ’ ছবিটিকে সর্বোচ্চ মানের বিনোদন হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেছিল।

আজ এক শতাব্দী পরেও ‘দ্য টেম্পট্রেস’ আমাদের সামনে অমলিন। সংরক্ষণের অভাবে নির্বাক যুগের অনেক ছবি হারিয়ে গেলেও, মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার করপোরেশনের নিবন্ধিত এই চলচ্চিত্রটির ৩৫ মিলিমিটার প্রিন্ট আমাদের জন্য বেঁচে আছে। গার্বো পরবর্তীতে ‘আনা ক্রিস্টি’, ‘গ্র্যান্ড হোটেল’, ‘কুইন ক্রিস্টিনা’, ‘কামিল’ ও ‘নিনোচকা’র মতো ধ্রুপদী সিনেমার মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। সেই দীর্ঘ পথচলার শুরুতে ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর জাদুকরী অভিনয় ও ক্যামেরা-সতর্কতা আজও চলচ্চিত্র গবেষকদের গবেষণার খোরাক জোগায়।

জনপ্রিয়

ঢাকার সিএমএম আদালতে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

শতবর্ষে গ্রেটা গার্বোর ‘দ্য টেম্পট্রেস’: এক সিনেমার দুই সমাপ্তি

আপডেট : ০৩:০০:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

পর্দায় এক তরুণীর মুখচ্ছবি। কখনো রহস্যে মোড়া, কখনো বিষণ্ন, আবার কখনো অদম্য আকর্ষণে ভরপুর। সংলাপহীন সেই যুগে শুধুমাত্র চোখের চাহনি ও শারীরিক অভিব্যক্তি দিয়ে দর্শককে সম্মোহিত করে রেখেছিলেন গ্রেটা গার্বো। ১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য টেম্পট্রেস’ সিনেমাটি সেই সময়ের গার্বোর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের নথিপত্র অনুযায়ী, আজ ছবিটির মুক্তির ১০০ বছর পূর্ণ হলো। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এই কালজয়ী অভিনেত্রীর শুরুর দিকের কাজগুলো আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। কখনো রহস্যময়, কখনো বিষণ্ন, কখনো আবার এমন আকর্ষণীয় যে চোখ ফেরানো কঠিন। কোনো সংলাপ নেই, কণ্ঠস্বর শোনারও সুযোগ নেই। শুধু চোখ–মুখের অভিব্যক্তি আর শরীরী ভাষা দিয়েই দর্শককে আটকে রাখছেন তিনি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি যে হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন, সেই গল্প তখনো লেখা হয়নি। উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ পরের বছর ‘দ্য টেম্পট্রেস’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক ভিসেন্তে ব্লাসকো ইবানিয়েসের ১৯২২ সালের উপন্যাস ‘লা তিয়েরা দে তোদোস’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল ‘দ্য টেম্পট্রেস’। এটি ছিল হলিউডে গার্বোর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র; এর আগে তিনি ‘দ্য টরেন্ট’-এর মাধ্যমে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। ছবিটির শুটিং শুরুর সময় গার্বোর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ সালে জন্ম নেওয়া এই তারকা যখন পর্দা কাঁপিয়ে মুক্তি পেলেন, তখন তাঁর বয়স সদ্য ২১ বছর। মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) প্রযোজিত এই ছবিটির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন টনি গাউদিও ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলস, যাঁরা গার্বোর পর্দায় উপস্থিতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সুইডেন থেকে আসা তরুণীকে নিয়ে হলিউডের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের (এমজিএম) আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গার্বোর হলিউডে তারকা হয়ে ওঠার শুরুর দিন, তাঁর গুরু মরিত্জ স্টিলারের সঙ্গে এমজিএমের সংঘাত, শুটিং শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই পরিচালক বদল এবং স্টুডিও-নিয়ন্ত্রিত হলিউডের এক অন্য রকম অধ্যায়। প্রযোজনা-সংযোগে ছিল এমজিএম, পরিবেশনার দায়িত্বেও ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

পর্দার বাইরের গল্পটিও ছিল বেশ ঘটনাবহুল। ছবিটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মরিত্জ স্টিলার, যিনি সুইডেনে থাকতেই গার্বোর প্রতিভা প্রথম শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ৩ এপ্রিল ১৯২৬ তারিখে শুটিং শুরুর ঠিক এক মাস পরেই ছন্দপতন ঘটে। এমজিএম কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মরিত্জ স্টিলারকে সরিয়ে ফ্রেড নিবলোকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকার ৫ মে ১৯২৬ সংখ্যায় এই রদবদলের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের গুরুর প্রতি স্টুডিওর এমন অবিচার গার্বোকে দারুণভাবে আহত করেছিল; এমনকি তিনি হলিউড ছেড়ে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। শেষ পর্যন্ত রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁর ক্যারিয়ারকে নতুন পথে চালিত করে।

‘দ্য টেম্পট্রেস’ নিয়ে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো এর দুটি ভিন্ন সমাপ্তি। মূল গল্পে একটি বিষাদময় সমাপ্তি ছিল যেখানে এলেনার করুণ পরিণতি দেখানো হয়। তবে এমজিএমপ্রধান লুই বি মেয়ারের নির্দেশে দর্শকদের জন্য একটি সুখের সমাপ্তিও চিত্রায়িত করা হয়েছিল। নির্বাক চলচ্চিত্র সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘সাইলেন্ট এরা’র নথিতে দেখা যায়, মূল নেগেটিভ প্রিন্টের পাশাপাশি এই বিকল্প সমাপ্তিও সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯২৬ সালের ২৩ অক্টোবর ‘মোশন পিকচার নিউজ’ ছবিটিকে সর্বোচ্চ মানের বিনোদন হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেছিল।

আজ এক শতাব্দী পরেও ‘দ্য টেম্পট্রেস’ আমাদের সামনে অমলিন। সংরক্ষণের অভাবে নির্বাক যুগের অনেক ছবি হারিয়ে গেলেও, মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার করপোরেশনের নিবন্ধিত এই চলচ্চিত্রটির ৩৫ মিলিমিটার প্রিন্ট আমাদের জন্য বেঁচে আছে। গার্বো পরবর্তীতে ‘আনা ক্রিস্টি’, ‘গ্র্যান্ড হোটেল’, ‘কুইন ক্রিস্টিনা’, ‘কামিল’ ও ‘নিনোচকা’র মতো ধ্রুপদী সিনেমার মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। সেই দীর্ঘ পথচলার শুরুতে ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর জাদুকরী অভিনয় ও ক্যামেরা-সতর্কতা আজও চলচ্চিত্র গবেষকদের গবেষণার খোরাক জোগায়।