Hi

০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাতৃভাষা চর্চা ও রাষ্ট্রীয় অনুবাদ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ১২:৩৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫ জন দেখেছে

উপনিবেশোত্তর সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে মাতৃভাষা চর্চার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা থেকে চিরায়ত সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তবে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তিনি সর্বদাই নিজস্ব জাতিভাষা বা মাতৃভাষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সচেতন ছিলেন।

মাতৃভাষাভিত্তিক চর্চার আবশ্যকতা সম্পর্কে কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিওঙ্গো তাঁর ‘ডিলাইকনাইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আদার রেভল্যুশনারি আইডিয়াস’ গ্রন্থের ‘মেকার্স ড্রিম’ অংশে উল্লেখ করেছেন যে, মাতৃভাষা বাদ দিয়ে বিশ্বের অন্য সব ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলেও মানুষ মূলত দাসত্বের শৃঙ্খলেই বন্দি থাকে। বিপরীতপক্ষে, নিজস্ব ভাষা রপ্ত করার পাশাপাশি অন্য আন্তর্জাতিক ভাষার শক্তি যুক্ত করা গেলে মানুষের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটে। ওদিকে, অগ্রাধিকারভিত্তিক মাতৃভাষা চর্চার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে নগুগি যথার্থই বলেছেন, “আপনি যদি নিজের মাতৃভাষা ছাড়া, জগতের অন্য সকল ভাষাও রপ্ত করে থাকেন, তাহলে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি রয়েছেন। অন্যদিকে, মাতৃভাষা যদি আপনার রপ্ত থাকে, আর তার সঙ্গে যদি জগতের অন্যান্য ভাষার শক্তি যুক্ত করেন, তাহলে আপনার ক্ষমতায়ন ঘটেছে।”২৯১।

বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশসহ কোনো রাষ্ট্রই মাতৃভাষায় শিক্ষাদান ব্যতিরেকে জাগতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। ফলে উন্নয়নকামী উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর জন্য মাতৃভাষাকেন্দ্রিক জনশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তবে আধুনিক বিশ্বে কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে বিদেশি ভাষার জ্ঞানও প্রয়োজন। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৫। আমরা বৈশ্বিক ইতিহাসের নানা অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পশ্চিমের প্রাক্তন উপনিবেশক দেশগুলোসহ, পৃথিবীর কোনো দেশই মাতৃভাষায় জনশিক্ষা বিস্তার ছাড়া নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জাগতিক উন্নয়নসাধন নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু এখানে এটাও উপলব্ধি করা জরুরি যে, ঔপনিবেশিক ভাষার বদলে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের ক্ষেত্রে, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ আপন আপন দেশে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় ইতিমধ্যেই যে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে, উপনিবেশোত্তর। তাছাড়া, সমকালীন আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্যও উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে অনেকগুলো বিদেশি ভাষা রপ্ত করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে হাজির রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানকে দেশীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার একমাত্র কার্যকরী উপায় হলো ব্যাপকভাবে অনুবাদের বিস্তার ঘটানো। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাজ্ঞ পণ্ডিতদের পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিশাল অনুবাদ প্রকল্প বাস্তবায়ন আবশ্যক, যা উপনিবেশোত্তর দেশগুলোকে বিউপনিবেশায়ন ও গণতান্ত্রিক মুক্তির সোপানে পৌঁছে দিতে পারে। তথ্যসূত্র: Ngugi wa thiong’o, ‘Makers Dream’, Dcolonizing Language and Other Revolutuinary Ideas, p, 73। এই প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর হলো, অনুবাদ — প্রচুর অনুবাদ।

জনপ্রিয়
© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মাতৃভাষা চর্চা ও রাষ্ট্রীয় অনুবাদ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ১২:৩৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

উপনিবেশোত্তর সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে মাতৃভাষা চর্চার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা থেকে চিরায়ত সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তবে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তিনি সর্বদাই নিজস্ব জাতিভাষা বা মাতৃভাষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সচেতন ছিলেন।

মাতৃভাষাভিত্তিক চর্চার আবশ্যকতা সম্পর্কে কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিওঙ্গো তাঁর ‘ডিলাইকনাইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আদার রেভল্যুশনারি আইডিয়াস’ গ্রন্থের ‘মেকার্স ড্রিম’ অংশে উল্লেখ করেছেন যে, মাতৃভাষা বাদ দিয়ে বিশ্বের অন্য সব ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলেও মানুষ মূলত দাসত্বের শৃঙ্খলেই বন্দি থাকে। বিপরীতপক্ষে, নিজস্ব ভাষা রপ্ত করার পাশাপাশি অন্য আন্তর্জাতিক ভাষার শক্তি যুক্ত করা গেলে মানুষের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটে। ওদিকে, অগ্রাধিকারভিত্তিক মাতৃভাষা চর্চার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে নগুগি যথার্থই বলেছেন, “আপনি যদি নিজের মাতৃভাষা ছাড়া, জগতের অন্য সকল ভাষাও রপ্ত করে থাকেন, তাহলে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি রয়েছেন। অন্যদিকে, মাতৃভাষা যদি আপনার রপ্ত থাকে, আর তার সঙ্গে যদি জগতের অন্যান্য ভাষার শক্তি যুক্ত করেন, তাহলে আপনার ক্ষমতায়ন ঘটেছে।”২৯১।

বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশসহ কোনো রাষ্ট্রই মাতৃভাষায় শিক্ষাদান ব্যতিরেকে জাগতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। ফলে উন্নয়নকামী উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর জন্য মাতৃভাষাকেন্দ্রিক জনশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তবে আধুনিক বিশ্বে কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে বিদেশি ভাষার জ্ঞানও প্রয়োজন। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৫। আমরা বৈশ্বিক ইতিহাসের নানা অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পশ্চিমের প্রাক্তন উপনিবেশক দেশগুলোসহ, পৃথিবীর কোনো দেশই মাতৃভাষায় জনশিক্ষা বিস্তার ছাড়া নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জাগতিক উন্নয়নসাধন নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু এখানে এটাও উপলব্ধি করা জরুরি যে, ঔপনিবেশিক ভাষার বদলে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের ক্ষেত্রে, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ আপন আপন দেশে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় ইতিমধ্যেই যে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে, উপনিবেশোত্তর। তাছাড়া, সমকালীন আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্যও উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে অনেকগুলো বিদেশি ভাষা রপ্ত করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে হাজির রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানকে দেশীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার একমাত্র কার্যকরী উপায় হলো ব্যাপকভাবে অনুবাদের বিস্তার ঘটানো। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাজ্ঞ পণ্ডিতদের পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিশাল অনুবাদ প্রকল্প বাস্তবায়ন আবশ্যক, যা উপনিবেশোত্তর দেশগুলোকে বিউপনিবেশায়ন ও গণতান্ত্রিক মুক্তির সোপানে পৌঁছে দিতে পারে। তথ্যসূত্র: Ngugi wa thiong’o, ‘Makers Dream’, Dcolonizing Language and Other Revolutuinary Ideas, p, 73। এই প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর হলো, অনুবাদ — প্রচুর অনুবাদ।