Hi

০৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষায় প্রয়াত অভিনেত্রী নাসিমা খান

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের সোনালী সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান ৮২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। গত ১১ অক্টোবর রোববার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন পেরিয়ে তাঁর প্রস্থান চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ও সন্তানদের স্মৃতি রেখে গেছেন, তবে শেষ জীবনে ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশলকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তিনি। কুশল গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁর সন্ধান পেতে বারবার সংবাদমাধ্যমের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। স্বামী একজন অতিথিকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে গেছেন। পরিচালকের নির্দেশমতো দৌড় দিলেন নায়িকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়লেন নিচে। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে দেখা হচ্ছে তাঁর অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায়। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা পরে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)।

১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারের সান্নিধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। প্রতিবেশী চিত্রপরিচালক খান আতাউর রহমানের সূত্রে অভিনয়ের সাথে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর ‘তানহা’ ও ‘যে নদী মরুপথে’-এর মতো একাধিক চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।

নাসিমা খানের কর্মজীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ১৯৬৬ সালের ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রের শুটিং। সে সময় পরিচালক নজরুল ইসলামের নির্দেশনায় একটি দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে তিনি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। বিয়ের পর স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যে অভিনয়ের সময় পেছন থেকে হঠাৎ ধাক্কা দেওয়ায় তিনি সিঁড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পান। তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি যে বাস্তবসম্মত করতে এভাবে ধাক্কা দেওয়া হবে। এই চোটের কারণে তিন দিন তিনি নড়াচড়া করতে পারেননি। ১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আত্মকথনে তিনি জানান, ব্যথায় কাতর থাকা অবস্থায়ও ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী তাঁকে বাবলী নামে ডেকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, কারণ দৃশ্যটি নিখুঁত হয়েছে। সেসব স্মৃতির মধ্যেই রয়েছে ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ের এ ঘটনা।

তবে পরিচালক নজরুল ইসলামের (যাকে তিনি নজু ভাই বলে ডাকতেন) ওপর কোনো ক্ষোভ ছিল না নাসিমা খানের। তাঁর ভাষায়, তখনকার চলচ্চিত্রাঙ্গন ছিল অনেকটা পরিবারের মতো। শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তরিকতা ছিল অটুট। কারিগরি দক্ষতার চেয়েও মানবিক সম্পর্কই তখন বড় ছিল। এছাড়া ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ চলচ্চিত্রে কাজ করতে গিয়েও তিনি কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে সময় দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে নির্দেশনার জটিলতায় ১২ থেকে ১৪ বার চেষ্টার পর দৃশ্য ধারণ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র অঙ্গনের বাইরের একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন নাসিমা খান। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৭৯ সালে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি আবারও পর্দায় ফেরেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর পড়াশোনার প্রতিও ছিল প্রবল আগ্রহ, যে কারণে পারিবারিক শর্ত ছিল পড়াশোনায় যেন কোনো অবহেলা না হয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন। বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হলেও ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশলের নিখোঁজ হওয়া তাঁর জীবনের শেষ কয়েক মাসের প্রধান বিষাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

চুয়েট উপাচার্য ভবনে তালা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষায় প্রয়াত অভিনেত্রী নাসিমা খান

আপডেট : ০১:৫৪:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের সোনালী সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান ৮২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। গত ১১ অক্টোবর রোববার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন পেরিয়ে তাঁর প্রস্থান চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ও সন্তানদের স্মৃতি রেখে গেছেন, তবে শেষ জীবনে ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশলকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তিনি। কুশল গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁর সন্ধান পেতে বারবার সংবাদমাধ্যমের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। স্বামী একজন অতিথিকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে গেছেন। পরিচালকের নির্দেশমতো দৌড় দিলেন নায়িকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়লেন নিচে। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে দেখা হচ্ছে তাঁর অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায়। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা পরে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)।

১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারের সান্নিধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। প্রতিবেশী চিত্রপরিচালক খান আতাউর রহমানের সূত্রে অভিনয়ের সাথে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর ‘তানহা’ ও ‘যে নদী মরুপথে’-এর মতো একাধিক চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।

নাসিমা খানের কর্মজীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ১৯৬৬ সালের ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রের শুটিং। সে সময় পরিচালক নজরুল ইসলামের নির্দেশনায় একটি দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে তিনি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। বিয়ের পর স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যে অভিনয়ের সময় পেছন থেকে হঠাৎ ধাক্কা দেওয়ায় তিনি সিঁড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পান। তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি যে বাস্তবসম্মত করতে এভাবে ধাক্কা দেওয়া হবে। এই চোটের কারণে তিন দিন তিনি নড়াচড়া করতে পারেননি। ১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আত্মকথনে তিনি জানান, ব্যথায় কাতর থাকা অবস্থায়ও ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী তাঁকে বাবলী নামে ডেকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, কারণ দৃশ্যটি নিখুঁত হয়েছে। সেসব স্মৃতির মধ্যেই রয়েছে ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ের এ ঘটনা।

তবে পরিচালক নজরুল ইসলামের (যাকে তিনি নজু ভাই বলে ডাকতেন) ওপর কোনো ক্ষোভ ছিল না নাসিমা খানের। তাঁর ভাষায়, তখনকার চলচ্চিত্রাঙ্গন ছিল অনেকটা পরিবারের মতো। শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তরিকতা ছিল অটুট। কারিগরি দক্ষতার চেয়েও মানবিক সম্পর্কই তখন বড় ছিল। এছাড়া ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ চলচ্চিত্রে কাজ করতে গিয়েও তিনি কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে সময় দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে নির্দেশনার জটিলতায় ১২ থেকে ১৪ বার চেষ্টার পর দৃশ্য ধারণ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র অঙ্গনের বাইরের একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন নাসিমা খান। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৭৯ সালে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি আবারও পর্দায় ফেরেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর পড়াশোনার প্রতিও ছিল প্রবল আগ্রহ, যে কারণে পারিবারিক শর্ত ছিল পড়াশোনায় যেন কোনো অবহেলা না হয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন। বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হলেও ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশলের নিখোঁজ হওয়া তাঁর জীবনের শেষ কয়েক মাসের প্রধান বিষাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।