বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া মাসুমা জাহান রিমা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একজন বহুমুখী সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। হাসিমুখে জাহান রিমা বলেন, ‘তারা আমার পাওয়ারহাউস। সেই পথের এক প্রান্তে চিকিৎসাসেবা, অন্য প্রান্তে সাহিত্য। এখনো অনেক পথ বাকি; কিন্তু আমি আমার নিজের মতো করে সফল।
পেশাগত জীবনে তিনি একজন ডেন্টাল হাইজিনিস্ট হলেও গত এক যুগের বেশি সময় ধরে লেখক, অর্ধযুগ ধরে শিল্পী এবং সম্প্রতি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তবে ব্যবসাকে তিনি নিছক লাভ-ক্ষতির অঙ্কে আটকে রাখেননি; নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সার্বক্ষণিক শিল্পী হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শপিং মলে এখন তিনি নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। নিজের পথচলা সম্পর্কে জাহান রিমা বলেন, তাঁর জীবনটা মূলত মিশ্র ধরনের। তিনি পেশায় একজন ডেন্টাল হাইজিনিস্ট, মনের টানে লেখক, আবেগে শিল্পী এবং নিজের ইচ্ছায় একজন উদ্যোক্তা। কোন পরিচয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ করে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি হেসে জানান, সবগুলোই তিনি, আবার কোনোটাই শুধু তিনি নন। জীবনের একেকটি বাঁকে তিনি একেকটি রূপকে সততার সঙ্গে সামনে এনেছেন।
করোনা মহামারিতে সম্মুখসারির সেবা ও মার্কিন স্বীকৃতি
করোনাভাইরাস মহামারির সংকটময় সময়ে সেবাকর্মী হিসেবে সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়েছিলেন রিমা। নিজের ডেন্টাল হাইজিন পেশার জায়গায় থেকে গোটা বিশ্ব যখন সুরক্ষার জন্য বন্দি, তখন তিনি মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন। ২০২০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ছুটে যান আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে। মহামারির সময়ে দুর্গম অঞ্চলে মানুষের পাশে চিকিৎসা ও সেবা নিয়ে দাঁড়ানোর এই অনন্য মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা ‘রিমোট এরিয়া মেডিক্যাল’ (র্যাম) তাঁকে বিশেষ প্রশংসাপত্র বা সার্টিফিকেট অব অ্যাপ্রিসিয়েশন প্রদান করে।
সাহিত্যচর্চা, সম্পাদনা ও সংস্কৃতি জগতে পদচারণা
মানুষের শারীরিক সেবার পাশাপাশি তাদের মন ও সম্পর্ককে শব্দে ফুটিয়ে তোলার তাগিদ থেকে শুরু হয় তাঁর সাহিত্যচর্চা। ২০১৯ সালে জাহান রিমার প্রথম গল্পের বই ‘যে তুমি মানুষ খোঁজো’ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০২১ সালে তাঁর যমজ বোন জাহান রিপার সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করেন কবিতার বই ‘রিপাবনে বিভোরিমা’। বর্তমানে তিনি ‘আনন্দবাড়ির আব্বু’ শিরোনামে তাঁর তৃতীয় বই লেখার কাজ করছেন। সাহিত্যজগতে তাঁর বিচরণ বেশ পুরোনো; ২০১৪ সালে তাঁর রচিত কবিতা নিয়ে নির্মিত একটি আবৃত্তি ও সংগীতের ভিডিওতে দেশের একজন সুপরিচিত আবৃত্তিশিল্পী কণ্ঠ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা পত্রিকাতেও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের হাসির যত্ন নেওয়া পেশা হলেও মানুষের মন, সম্পর্ক আর জীবনকে শব্দে বাঁধার তাড়না থেকে জন্ম নেয় তাঁর লেখক পরিচয়।
- ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোভিত্তিক বাংলা সাময়িকী ‘একতারা’রEditorial ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে।
- সংবাদমাধ্যম ‘বাংলাটাইমস ৩৬০’–এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
শিক্ষাজীবনের পরিবর্তন ও পেশাগত রূপান্তর
জাহান রিমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মূল ভিত তৈরি হয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবনে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করেন। নতুন করে ভর্তি হন স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও ডেন্টাল হাইজিন বিষয়ে। দীর্ঘ ছয় থেকে সাত বছরের নিবিড় ও কঠোর পড়াশোনা শেষে তিনি একটি জরুরি ডেন্টাল ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন। তবে নিজের ভেতরের শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতাকে ধরে রেখে তিনি পরবর্তীতে ব্যবসার জগতে পা রাখার সিদ্ধান্ত নেন। একটি পরিচয় শেষ হওয়ার আগেই যেন আরেকটি পরিচয় এসে কড়া নেড়েছে দরজায়। এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর পুরো জীবনদর্শন।
ব্যবসা ও শিল্পের সংযোগ: ‘জাহান’স আর্টিস্টিক ওয়ার্ল্ড’
প্রায় পাঁচ বছর আগে ফ্লোরিডার অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ত শপিং মল ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’-এ একটি কিয়স্কের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘জাহান’স আর্টিস্টিক ওয়ার্ল্ড’। সেখানে তিনি দেশীয় ও সার্বজনীন শিল্পকর্ম যেমন মেহেদি, বডি আর্ট, পোর্ট্রেট, ক্যারিকেচার ও পেইন্টিং নিয়ে সেবা দেওয়া শুরু করেন। নতুন ব্যবসা শুরুর স্মৃতির কথা উল্লেখ করে জাহান রিমা বলেন, শুরুতে চড়া ভাড়া ও অনিশ্চয়তার কারণে তিনি ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন। তবে মার্কিন লেখক জ্যাক উলড্রিচের একটি উক্তি তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল—যে কাজটি রোমাঞ্চিত ও ভীত করে, সেটিই করা উচিত। তার ওপর ছিল মলের চড়া ভাড়া আর অনিশ্চয়তা।
উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন উচ্চতা ও কাজের ধারা
ব্যবসায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে তিনি ইউনিভার্সাল স্টুডিওর শিল্পীর চাকরি ছেড়ে দেন এবং ডিজনি ওয়ার্ল্ডের মরক্কো প্যাভিলিয়নে যোগ দেওয়ার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন। নিরাপদ ডেন্টাল প্র্যাকটিসের পাশাপাশি নিজের গড়ে তোলা প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ দেন। বর্তমানে ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’ ছাড়াও হাই-এন্ড শপিং মল ‘অরল্যান্ডো ভাইনল্যান্ড প্রিমিয়াম আউটলেটস’-এ তাঁর নতুন শাখা চালু রয়েছে। পাশাপাশি অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (এমসিও) রয়েছে তাঁর একটি লন্ড্রোম্যাট ব্যবসা।
- সাফল্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি জানান, মনের সুখ এবং নিজের অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত সাফল্য।
- বাংলাদেশের ট্র্যাডিশনাল মেহেদি আর্টকে আমেরিকার বড় মলে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পেরে তিনি দারুণ আনন্দিত।
- তেলরং, জলরং, মিনিমালিস্ট ওয়ান-লাইন আর্ট ও মিক্সড মিডিয়ায় নিয়মিত কাজ করেন এবং নতুন গুরুর কাছে ক্যারিকেচার শিখছেন।
- নিজের পরিবারকে ‘পাওয়ারহাউস’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া রিমার কাজের কথা সম্প্রতি ‘অরল্যান্ডো ভয়েজার’ ম্যাগাজিনের ‘হিডেন জেম’ সিরিজে প্রকাশিত হয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 
























