ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন চুক্তির লক্ষ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানোর শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা না থাকলে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ জ্বালানির প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যমতে, ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ করতে সক্ষম, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের চেয়ে কম। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভ্যান্স। তবে মার্কিন প্রশাসনে এখনও কঠোর অবস্থানের সুর প্রবল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, এই পরিস্থিতির সমাধান ‘ভালো কিংবা মন্দ’ যেকোনো পথেই হতে পারে। এদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও। আলোচনার পর এ পর্যন্ত তারা তিনবার আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। যারা প্রতিদিন নিষেধাজ্ঞা, গুপ্তহত্যা ও সামরিক হুমকি দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে না।
মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি অবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাকে ‘অর্থহীন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, কূটনীতির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানি সরকারের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, আলোচনার টেবিলে বসার পরপরই তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অতীতে কয়েকবার আলোচনার পরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যদি ‘ন্যায়বিচার ও সমতার’ ভিত্তিতে আলোচনা হয়, তবেই সংঘাত নিরসনের সুযোগ রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল অন্তরায়গুলো আরও গভীর। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মতে, ওয়াশিংটন ইউরেনিয়াম ইস্যুতে কিছুটা নমনীয় হওয়ার কৌশল নিলেও তেহরানের কাছে মূল সংকট এটি নয়। ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া, জব্দ থাকা অর্থ ফেরত দেয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের স্থায়ী সমাপ্তি। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া এবং ধাপে ধাপে চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক করার চাপে যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে ছাড় দিতে চাইছে। কিন্তু পানামার পতাকাবাহী ট্যাংকারে হামলায় ১২ নাবিকের আহত হওয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করে প্রণালিটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে পরমাণু কর্মসূচি কমানোর মার্কিন শর্তের চেয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনই এখন টেকসই সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধের আগের অনড় অবস্থান থেকে ওয়াশিংটনের কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টার নাম: 























