যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্প্রতি তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার সময় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে মূল উড়োজাহাজ থেকে সরিয়ে একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার দেশটির বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ কংগ্রেশনাল ব্রিফিং দাবি করেছেন। মূলত, ইরানের সম্ভাব্য হত্যা প্রচেষ্টার বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা হুমকির মুখে ট্রাম্পের জীবন বাঁচাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে মূল ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজটিতে থাকা শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা, প্রেসিডেন্টের সহকারী ও পেশাদার সাংবাদিকদের এই চরম ঝুঁকি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা এবং তাঁদের অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘টোপ’ বা আড়াল হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারে যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হত্যা পরিকল্পনা রয়েছে। তখন তুরস্ক থেকে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা দল এক নাটকীয় কৌশলের আশ্রয় নেয়। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা গেলেও, যাত্রার ঠিক আগে তাঁকে গোপনে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের সাহায্যে এবং পরবর্তীতে বিমানবাহিনীর সি-৩২এ সামরিক উড়োজাহাজে স্থানান্তরিত করা হয়। অথচ উড়োজাহাজে থাকা সাংবাদিক ও সহকারীরা বিশ্বাস করতেন যে প্রেসিডেন্ট তাঁদের সঙ্গেই মূল বিমানে রয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, যাত্রাপথে সাংবাদিকদের জানালার পর্দা টেনে রাখতে বলা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই কৌশলের নৈতিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘স্টেডি স্টেট’-এর নির্বাহী পরিচালক এবং সিআইএর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্টিভেন ক্যাশ মন্তব্য করেছেন যে, এই কৌশলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ঝুঁকি কমাতে গিয়ে অজান্তেই শত বা তার বেশি নিরপরাধ যাত্রীকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত নেড প্রাইস বর্তমান প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা গেলেও, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করা এবং সত্যের প্রতি অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, সততা বজায় রেখেও যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সামলানো সম্ভব ছিল।
কংগ্রেসে এই ঘটনা নিয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল একে ‘নজিরবিহীন, অদ্ভুত এবং চরম ভীতিকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ কর্মী ও সাংবাদিকরা কী ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তাঁদের সুরক্ষায় কী রূপ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা সরকারকে দিতেই হবে। অন্যদিকে, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক হোসে জামোরা বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে গণমাধ্যমকর্মীদের অন্ধকারে রাখা এবং তাদের জেনেশুনে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা প্রশাসনের একধরনের বড় ব্যর্থতা।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্পূর্ণ গোপনীয়তা এবং সিক্রেট সার্ভিসের কৌশলকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন যে, শেষ পর্যন্ত তিনি যে বিকল্প সামরিক বিমানে চড়েছিলেন, সেটিতেই মূলত বেশি ঝুঁকি ছিল। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, শত্রুপক্ষ মূল এয়ারফোর্স ওয়ানের চেয়ে বিকল্প বিমানটিকে আক্রমণের জন্য অধিকতর লক্ষ্যবস্তু মনে করতে পারত। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষকদের মধ্যে এই হুমকির বাস্তব মাত্রা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের পারমাণবিক নীতি বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পান্ডা এবং ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো জেফরি লুইস উভয়েই উল্লেখ করেছেন যে, তুরস্কের মতো একটি বন্ধুভাবাপন্ন ও সুরক্ষিত ন্যাটো ভূখণ্ডে বা আকাশসীমায় ইরানের পক্ষে এ ধরনের আকস্মিক ও সরাসরি সামরিক হামলা চালানো তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ও অসম্ভবপ্রায় একটি বিষয় ছিল।
সব মিলিয়ে, এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা কৌশল এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ককে নতুন এক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে সংবাদকর্মী ও নাগরিকদের স্বচ্ছতা পাওয়ার অধিকার—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে এখন মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তীব্র আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। কাতার সরকারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজের প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রার প্রেক্ষাপটে এই নিরাপত্তা সংকট পরিস্থিতিটিকে আরও বেশি জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। আগামী দিনে কংগ্রেসে এই বিষয়ে আরও কড়া জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে পারে বর্তমান প্রশাসন।
রিপোর্টার নাম: 





















