রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বর্তমান সময়ের তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, আজকাল নতুন প্রজন্মের কিছু নেতার বক্তব্যে যে ধরনের ভাষা ও ভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সুস্থ গণতন্ত্র, সামাজিক সভ্যতা এবং উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের সেই বিতর্কিত ও উগ্র অপসংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই রক্তাক্ত: স্মরণ ও প্রত্যয়’ শীর্ষক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী দেশের রাজনৈতিক বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় শেখ হাসিনা নিয়মিত মিথ্যাচার ও নোংরা অপপ্রচারের আশ্রয় নিতেন। বিএনপি বা অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে এবং তাঁর সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের কঠোর সমালোচনা করলেও কখনোই কোনো ধরনের অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেননি। তাঁর মতে, সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি ছক কষে কেউ কখনো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না, যার প্রমাণ জুলাই মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে তরুণদের উচিত পুরোনো ভুলের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি ইতিবাচক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। তিনি এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও একটি পশ্চাৎপদ দলের সঙ্গে তাদের জোট গঠন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রিজভী মনে করেন, তরুণ রাজনীতিবিদদের চিন্তাভাবনা হওয়া উচিত সর্বদা প্রগতিশীল, অগ্রগামী এবং দেশের মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। বিগত সরকারের পতনের নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে দেশের জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন এবং রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে নিজের শাসন টিকিয়ে রাখার দুঃসাহসী চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এ দেশের সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাহস, ত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে হেলিকপ্টার থেকেও সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালাতে তাঁর বুক কাঁপেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ১৭ বছরের দীর্ঘ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের চূড়ান্ত ফসল হিসেবে অভিহিত করে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজীবন আপসহীন থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। শত চাপ ও নির্যাতন সত্ত্বেও শেখ হাসিনা তাঁকে তাঁর দৃঢ় অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেননি। এছাড়া বর্তমান প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল ও দলীয় নিয়োগের সমসাময়িক বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়েলস সিস্টেম’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পদে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া একটি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ও আইনগত প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তবে দেশের ইতিহাসে অতীতে কখনো দেখা যায়নি এমন নজিরবিহীন ও বড় ধরনের দলীয়করণের ঘটনা ঘটবে।
অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন ছাত্রশিবিরের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা নারীদের হেনস্তা ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এখন তারা হঠাৎ নারী সুরক্ষার কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আলাদা ‘ফিমেল কর্নার’ চালু করেছে, যার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এছাড়া এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন তির্যক ও অশালীন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ পরিহার করে তাঁর রাজনীতি থেকে কিছুদিনের জন্য দূরে থাকা উচিত। রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, শিক্ষার্থীরা এমন একজন বিতর্কিত ও উগ্র আচরণকারী ব্যক্তিকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন যিনি নীতিনির্ধারণে কাজ না করে বেলচা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখান এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে সাধারণ ছাত্রসমাজ ও জনতা এর যথাযথ জবাব দিতে পিছপা হবে না বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
রিপোর্টার নাম: 



















