Hi

০২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নির্ভীক কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার তাগিদ

গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকেরা নিজেদের চোখে যা দেখেন, তা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে লেখার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিশিষ্ট বক্তারা। রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘মিডিয়া রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিজ’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের সংকট, সেন্সরশিপ এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

আলোচনায় সুহাসিনী হায়দার বলেন, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান সংকট সরাসরি কোনো সরকারি সেন্সরশিপ নয়, বরং সাংবাদিকদের নিজেদের ভেতরে তৈরি হওয়া ‘স্ব-সেন্সরশিপ’। অতীতে সংবাদমাধ্যমের ওপর বাহ্যিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা ছিল প্রকাশ্য। সরকার অনেক সময় সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ করত, সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠাত কিংবা সংবাদপত্রের মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান সংবাদ পরিবেশনকে একপেশে করে তুলত। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সাংবাদিকেরা নিজেরাই বিভিন্ন অদৃশ্য কারণে সংবাদের চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। মাঠের প্রতিবেদকদের নিজেদের দেখা বাস্তবতাকে তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা না দিলে গণমাধ্যমের প্রকৃত রূপ হারিয়ে যায়। একজন পেশাদার সাংবাদিক আর সাধারণ নাগরিকের মূল পার্থক্য হলো—সাংবাদিক তথ্য যাচাই করেন, সব পক্ষের বক্তব্য অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে শোনেন, ঘটনাকে তার সুনির্দিষ্ট বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসেন।

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কর্তৃত্ববাদের উত্থান নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে সুহাসিনী হায়দার বলেন, ২০০৮ সালের গভীর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের জনপ্রিয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বহুত্ববাদ, মানবাধিকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর নানা ধরনের চাপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংকট কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের একটি অভিন্ন ও কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে সবার হাতে ক্যামেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও পেশাদার সাংবাদিকতার গুরুত্ব এক বিন্দুও কমে যায়নি। মানুষের গভীর আস্থা অর্জন করতে হলে গণমাধ্যমকে 반드시 নির্ভরযোগ্য তথ্য, গভীর বিশ্লেষণ এবং সঠিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করতে হবে। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো তথ্য সরবরাহ করা, সচেতনতা তৈরি করা এবং ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, কোনোভাবেই বিনোদন দেওয়া নয়। সংবাদমাধ্যমকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে খরচ কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপননির্ভরতা কাটিয়ে পাঠকনির্ভর রাজস্ব মডেলে রূপান্তর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নেপালের প্রবীণ সাংবাদিক কনক মানি দীক্ষিত পশ্চিমা গণমাধ্যমের অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতে আমরা পশ্চিমা মিডিয়াকে সাংবাদিকতার আদর্শ হিসেবে মূল্যায়ন করতাম, কিন্তু গাজা সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনায় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ও দুর্বলতা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই কাঠমান্ডু, দিল্লি, ঢাকা, ইসলামাবাদ বা কলম্বো—আমাদের প্রতিটি অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিজেদের মানদণ্ড নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

প্যানেল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। তিনি বর্তমান গণমাধ্যমের কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সংবাদপত্রের প্রচলন কমছে এবং টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে দর্শক কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো আমরা বর্তমানে পর্যাপ্ত ‘সাংবাদিকতা’ করছি না। মিডিয়াগুলো এখন কেবল ‘কথার দোকান’ বা অন্তহীন টক শোতে পরিণত হয়েছে। মাঠের বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদন বাদ দিয়ে স্টুডিওভিত্তিক কথার লড়াই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হতে পারে না। সাংবাদিকদের মাঠে নেমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। ঢাকা ট্রিবিউনের সাবেক সম্পাদক জাফর সোবহানের পরিচালনায় এই প্যানেল আলোচনাটি দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

জনপ্রিয়

৬২ বছরের বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনে শিল্পকলায় প্রথম একক কনসার্টে মাতালেন রুনা লায়লা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নির্ভীক কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার তাগিদ

আপডেট : ১১:১২:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকেরা নিজেদের চোখে যা দেখেন, তা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে লেখার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিশিষ্ট বক্তারা। রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘মিডিয়া রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিজ’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের সংকট, সেন্সরশিপ এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

আলোচনায় সুহাসিনী হায়দার বলেন, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান সংকট সরাসরি কোনো সরকারি সেন্সরশিপ নয়, বরং সাংবাদিকদের নিজেদের ভেতরে তৈরি হওয়া ‘স্ব-সেন্সরশিপ’। অতীতে সংবাদমাধ্যমের ওপর বাহ্যিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা ছিল প্রকাশ্য। সরকার অনেক সময় সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ করত, সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠাত কিংবা সংবাদপত্রের মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান সংবাদ পরিবেশনকে একপেশে করে তুলত। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সাংবাদিকেরা নিজেরাই বিভিন্ন অদৃশ্য কারণে সংবাদের চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। মাঠের প্রতিবেদকদের নিজেদের দেখা বাস্তবতাকে তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা না দিলে গণমাধ্যমের প্রকৃত রূপ হারিয়ে যায়। একজন পেশাদার সাংবাদিক আর সাধারণ নাগরিকের মূল পার্থক্য হলো—সাংবাদিক তথ্য যাচাই করেন, সব পক্ষের বক্তব্য অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে শোনেন, ঘটনাকে তার সুনির্দিষ্ট বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসেন।

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কর্তৃত্ববাদের উত্থান নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে সুহাসিনী হায়দার বলেন, ২০০৮ সালের গভীর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের জনপ্রিয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বহুত্ববাদ, মানবাধিকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর নানা ধরনের চাপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংকট কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের একটি অভিন্ন ও কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে সবার হাতে ক্যামেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও পেশাদার সাংবাদিকতার গুরুত্ব এক বিন্দুও কমে যায়নি। মানুষের গভীর আস্থা অর্জন করতে হলে গণমাধ্যমকে 반드시 নির্ভরযোগ্য তথ্য, গভীর বিশ্লেষণ এবং সঠিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করতে হবে। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো তথ্য সরবরাহ করা, সচেতনতা তৈরি করা এবং ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, কোনোভাবেই বিনোদন দেওয়া নয়। সংবাদমাধ্যমকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে খরচ কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপননির্ভরতা কাটিয়ে পাঠকনির্ভর রাজস্ব মডেলে রূপান্তর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নেপালের প্রবীণ সাংবাদিক কনক মানি দীক্ষিত পশ্চিমা গণমাধ্যমের অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতে আমরা পশ্চিমা মিডিয়াকে সাংবাদিকতার আদর্শ হিসেবে মূল্যায়ন করতাম, কিন্তু গাজা সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনায় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ও দুর্বলতা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই কাঠমান্ডু, দিল্লি, ঢাকা, ইসলামাবাদ বা কলম্বো—আমাদের প্রতিটি অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিজেদের মানদণ্ড নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

প্যানেল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। তিনি বর্তমান গণমাধ্যমের কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সংবাদপত্রের প্রচলন কমছে এবং টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে দর্শক কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো আমরা বর্তমানে পর্যাপ্ত ‘সাংবাদিকতা’ করছি না। মিডিয়াগুলো এখন কেবল ‘কথার দোকান’ বা অন্তহীন টক শোতে পরিণত হয়েছে। মাঠের বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদন বাদ দিয়ে স্টুডিওভিত্তিক কথার লড়াই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হতে পারে না। সাংবাদিকদের মাঠে নেমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। ঢাকা ট্রিবিউনের সাবেক সম্পাদক জাফর সোবহানের পরিচালনায় এই প্যানেল আলোচনাটি দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।