শিক্ষার্থীদের সংসদ অভিযান প্রতিহত করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছররা গুলি ব্যবহার করেছেন বলে অবশেষে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র্যাফ) একজন জওয়ান এই গুলি চালান বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) এই তথ্য পেয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের উপর ছররা গুলি চালানোর নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্ন আবারও জোরালো হয়েছে এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআরপিএফ দেখেছে যে ওই র্যাফ জওয়ান অন্তত ৭টি ছররা গুলি ব্যবহার করেছিলেন। এর মধ্যে ২টি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও ৫টি সরাসরি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শরীরে আঘাত হানে। ছররা গুলি সাধারণত মারাত্মক নয় হলেও, নিকট দূরত্ব থেকে ব্যবহার করা হলে তা গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে, এমনকি দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এই ধরনের মারণাস্ত্রবিহীন জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরেই প্রশ্ন তুলে আসছেন। যদিও সিআরপিএফ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেনি, তবে এই প্রাথমিক তথ্য সামনে আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আহত আন্দোলনকারীদের নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একজন আহত শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, আরও অনেক শিক্ষার্থী ছররা গুলির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের ছবি ও সাক্ষাৎকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি চিঠিও লিখেছেন। চিঠিতে তিনি জানতে চেয়েছেন, কেন আন্দোলনকারীদের ওপর ছররা গুলি চালানো হলো এবং সেই গুলি ছোড়ার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে দিয়েছিলেন কিনা।
রাহুল গান্ধী আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই নির্দেশ না দিয়ে থাকেন, তবে কে দিয়েছিলেন? পুলিশের সঙ্গে মিশে সাধারণ পোশাকে যারা নির্বিচারে লাঠি ও ব্যাটন চালিয়েছেন, তারা কারা – পুলিশ নাকি স্বেচ্ছাসেবক? কারা তাদের এ ধরনের সহিংসতা চালানোর অনুমতি দিয়েছেন? গত রোববার তিনি তার এই চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ পোস্ট করেন, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্য বিরোধী নেতারা এর আগেও শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে বিবৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন, যা এই ঘটনার রাজনৈতিক মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ছররা গুলি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল যে তারা পেলেট গান ব্যবহার করেনি। তবে কারা সেই গুলি চালিয়েছিল, তা তখন স্পষ্ট হয়নি, যার ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। সেই সময় জানা গিয়েছিল, সিআরপিএফ এই বিষয়ে র্যাফকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের ফলাফল এখন সামনে আসায়, দিল্লি পুলিশের আগের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এই পরস্পর বিরোধী তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে, যা একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে।
শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তর ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেলেও, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের ওপর হামলার খবর আসছে। উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু বীর সেনার একজন নেতা দুইজন ছাত্রকে চড় মারছেন, এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও আটটি এফআইআর দায়ের হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান ঘটনায় কেউ অভিযোগ না জানানোয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং দায়বদ্ধতার অভাবের দিকে আঙুল তুলেছে। এছাড়াও, আরেকজন ব্যক্তির অভিযোগ, যন্তর মন্তরে বিনামূল্যে খাবার বিলি করার অপরাধে পুলিশ পরিচয় দিয়ে কয়েকজন তাকে আটক করে। চোখ বেঁধে মুসৌরিতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ এই অভিযোগটি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ছাত্রনেতারা আন্দোলনকারীদের ওপর জারি করা সব মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং প্রকাশ্যে এই দাবি মেনে নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছিলেন। তবে পুলিশ সূত্র অনুযায়ী, এই বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশ এখনো তাদের কাছে পৌঁছায়নি, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া, আন্দোলন চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে যারা পোস্ট দিয়েছিলেন, দিল্লি পুলিশ তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে এই বিষয়ে নোটিশও পাঠানো হয়েছে এবং আপত্তিকর ভিডিও ও পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর একটি সম্ভাব্য আক্রমণ হিসাবে দেখা হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ডেস্ক সংবাদ 






















