Hi

০৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস ও প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ: মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ভারতের তরুণ প্রজন্ম

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার নজিরবিহীন পতন, ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁস এবং সরকারি উদাসীনতার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসা তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম দমনপীড়ন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানী নয়াদিল্লি সহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা সরকারের জবাবদিহি এবং মৌলিক শিক্ষাসংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে নরেন্দ্র মোদী প্রশাসন আলোচনার পথ এড়িয়ে চরম দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) চড়াও হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের নামে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, জলকামান ব্যবহার এবং নির্বিচারে লাঠিচার্জের মতো বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি বাড়িফেরা শিক্ষার্থীদের ওপরও চড়াও হয়ে পেলেট গানের ছররা ও লাঠিপেটার দৃশ্য জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের নির্মম পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব ছিল। কৃষকদের আন্দোলন বা মানবাধিকারকর্মীদের কণ্ঠরোধের মতোই ভিন্নমত দমনের পুরনো পথেই হাঁটছে বর্তমান প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই সংকটের মূল শিকড় নিহিত রয়েছে পাবলিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরকারের ক্রমান্বয়ে পিছু হটার মধ্যে। বিগত বছরগুলোতে বাজেটে স্কুলশিক্ষার বরাদ্দ প্রায় অর্ধেকে এবং উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়ে বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনুদান কমিয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য করায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ফি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রায় নাগালের বাইরে চলে গেছে।

দ্বিতীয়ত, দেশটির সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল চিত্রও আজ স্পষ্ট। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) অধীনে কেন্দ্রীকৃত পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর পর থেকেই একের পর এক প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। গত এক দশকে দেড় শতাধিক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলেও এর পেছনে থাকা সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। এনটিএ নিজেই কর্মী–সংকট ও বেসরকারি ঠিকাদারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক মান দ্রুত নিম্নগামী হয়েছে।

তৃতীয়ত, ভারতের তরুণ সমাজের সামনে বর্তমানে এক ভয়াবহ বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার পাহাড় জমেছে। স্নাতক সম্পন্ন করার পর মানসম্মত চাকরির অভাব এবং তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে তরুণরা আজ দিশাহারা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণের ফলে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আধুনিক যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার অভাব শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সংসদীয় কমিটির মতামত বা জাতীয় ঐকমত্যকে পাশ কাটানোর অভিযোগ রয়েছে। সবমিলিয়ে, ব্যয়বহুল শিক্ষা, দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের মধ্য দিয়ে ভারতের তরুণ সমাজ আজ দেয়াлы পিঠ ঠেকে যাওয়া এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।

জনপ্রিয়

দিল্লিতে জেন-জি বিক্ষোভ: প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্ববিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ভারতের রাজধানী

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস ও প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ: মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ভারতের তরুণ প্রজন্ম

আপডেট : ০৩:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার নজিরবিহীন পতন, ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁস এবং সরকারি উদাসীনতার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসা তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম দমনপীড়ন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানী নয়াদিল্লি সহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা সরকারের জবাবদিহি এবং মৌলিক শিক্ষাসংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে নরেন্দ্র মোদী প্রশাসন আলোচনার পথ এড়িয়ে চরম দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) চড়াও হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের নামে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, জলকামান ব্যবহার এবং নির্বিচারে লাঠিচার্জের মতো বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি বাড়িফেরা শিক্ষার্থীদের ওপরও চড়াও হয়ে পেলেট গানের ছররা ও লাঠিপেটার দৃশ্য জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের নির্মম পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব ছিল। কৃষকদের আন্দোলন বা মানবাধিকারকর্মীদের কণ্ঠরোধের মতোই ভিন্নমত দমনের পুরনো পথেই হাঁটছে বর্তমান প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই সংকটের মূল শিকড় নিহিত রয়েছে পাবলিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরকারের ক্রমান্বয়ে পিছু হটার মধ্যে। বিগত বছরগুলোতে বাজেটে স্কুলশিক্ষার বরাদ্দ প্রায় অর্ধেকে এবং উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়ে বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনুদান কমিয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য করায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ফি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রায় নাগালের বাইরে চলে গেছে।

দ্বিতীয়ত, দেশটির সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল চিত্রও আজ স্পষ্ট। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) অধীনে কেন্দ্রীকৃত পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর পর থেকেই একের পর এক প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। গত এক দশকে দেড় শতাধিক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলেও এর পেছনে থাকা সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। এনটিএ নিজেই কর্মী–সংকট ও বেসরকারি ঠিকাদারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক মান দ্রুত নিম্নগামী হয়েছে।

তৃতীয়ত, ভারতের তরুণ সমাজের সামনে বর্তমানে এক ভয়াবহ বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার পাহাড় জমেছে। স্নাতক সম্পন্ন করার পর মানসম্মত চাকরির অভাব এবং তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে তরুণরা আজ দিশাহারা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণের ফলে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আধুনিক যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার অভাব শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সংসদীয় কমিটির মতামত বা জাতীয় ঐকমত্যকে পাশ কাটানোর অভিযোগ রয়েছে। সবমিলিয়ে, ব্যয়বহুল শিক্ষা, দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের মধ্য দিয়ে ভারতের তরুণ সমাজ আজ দেয়াлы পিঠ ঠেকে যাওয়া এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।