Hi

০১:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীতি সুদহার হ্রাস: অর্থনীতির জটিল সংকট নিরসনে কি এটিই যথেষ্ট?

দীর্ঘ দুই বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। এই সিদ্ধান্তকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতি সুদহার কমানোর মাধ্যমে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা বা বিনিয়োগের গতি বাড়ানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশ যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি, তার পেছনে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অকার্যকারিতাই মূল ভূমিকা পালন করেছে।

মূল্যস্ফীতির কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমদানিকৃত পণ্যের বাড়তি ব্যয়, বিনিময় হারের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং পণ্য পরিবহন ও বিতরণের অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব এবং দুর্বল নজরদারি মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্ব নীতি বা সরবরাহ পক্ষীয় কোনো বড় সংস্কার গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি দমনে নীতি সুদহারের ব্যবহার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ হিসেবেই রয়ে গেছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নীতি সুদহার একমাত্র নিয়ামক নয়। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং নীতির অস্থিরতাকে মূল বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিনিয়োগকারী যখন তার মূলধনের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতির নিশ্চয়তা পান না, তখন সুদের হার সামান্য কমলে তিনি নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। বিনিয়োগ মূলত ব্যবসায়িক আস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা এখন পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিশেষে, বর্তমান সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্যের সামান্য প্রভাব পড়লেও এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক রূপরেখা। যেখানে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা, মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করা আবশ্যক। একইসঙ্গে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক উত্তরণ সম্ভব নয়। শুধু সুদহার কমিয়ে অর্থনীতির বহুমুখী সংকট সমাধানের আশা করা হলে তা ব্যর্থ হতে পারে।

জনপ্রিয়
© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

নীতি সুদহার হ্রাস: অর্থনীতির জটিল সংকট নিরসনে কি এটিই যথেষ্ট?

আপডেট : ০৮:২৬:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ দুই বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। এই সিদ্ধান্তকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতি সুদহার কমানোর মাধ্যমে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা বা বিনিয়োগের গতি বাড়ানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশ যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি, তার পেছনে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অকার্যকারিতাই মূল ভূমিকা পালন করেছে।

মূল্যস্ফীতির কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমদানিকৃত পণ্যের বাড়তি ব্যয়, বিনিময় হারের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং পণ্য পরিবহন ও বিতরণের অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব এবং দুর্বল নজরদারি মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্ব নীতি বা সরবরাহ পক্ষীয় কোনো বড় সংস্কার গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি দমনে নীতি সুদহারের ব্যবহার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ হিসেবেই রয়ে গেছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নীতি সুদহার একমাত্র নিয়ামক নয়। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং নীতির অস্থিরতাকে মূল বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিনিয়োগকারী যখন তার মূলধনের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতির নিশ্চয়তা পান না, তখন সুদের হার সামান্য কমলে তিনি নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। বিনিয়োগ মূলত ব্যবসায়িক আস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা এখন পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিশেষে, বর্তমান সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্যের সামান্য প্রভাব পড়লেও এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক রূপরেখা। যেখানে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা, মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করা আবশ্যক। একইসঙ্গে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক উত্তরণ সম্ভব নয়। শুধু সুদহার কমিয়ে অর্থনীতির বহুমুখী সংকট সমাধানের আশা করা হলে তা ব্যর্থ হতে পারে।