Hi

১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার নোয়াখালীর একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ দাফন: এলাকায় শোকের ছায়া

ভাগ্য বদলের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের কামাল উদ্দিন বাবুল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক বীভৎস ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি তাঁর পরিবার। ইতালির রাজধানী রোমে আততায়ীর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নিহত সেই একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরেছে। আজ শুক্রবার সকালে কফিনে করে কামাল উদ্দিন (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু আক্তার (৩৮) এবং তাঁদের আদরের পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আরোয়া ইসলামের নিথর দেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো তাঁদের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় এদিন কোম্পানীগঞ্জের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিকেলে মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছানোর পর এক নজর দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমান শত শত মানুষ। বাদ মাগরিব স্থানীয় শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তিনজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত কামালের বৃদ্ধ বাবা সিরাজুল ইসলাম যখন বিলাপ করে বলছিলেন, তাঁর ছেলেই কিছুদিন আগে দেশে এসে পারিবারিক কবরস্থান সংস্কার করে গিয়েছিল, তখন সেখানে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে কবরস্থান তিনি নিজ হাতে গুছিয়েছিলেন, আজ সেখানেই স্ত্রী-সন্তানসহ চিরনিদ্রায় শায়িত হতে হলো তাঁকে।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৬ জুন রাতে ইতালির রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা কামাল উদ্দিনের বাসায় ঢুকে তছনছ করে দেয় সুখের সংসার। ঘটনাস্থলেই মারা যান স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের ছোট সন্তান। তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তাঁদের পুত্র অয়ন, যে কিনা বর্তমানে গভীর ট্রমা ও শোক নিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। এ হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ইতালির পুলিশ এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে দফায় দফায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, তা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁদের বাড়িতে ‘লাল বাহিনী’ নামক একটি দুষ্কৃতকারী চক্রের পক্ষ থেকে হুমকি সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠিতে মোটা অঙ্কের টাকা ও স্বর্ণালংকার দাবি করা হয় এবং তা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই হুমকির পর স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিলেন তাঁরা। তবে সেই হুমকির সঙ্গে রোমের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে ইতালীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এবং গোয়েন্দারা সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করছে। প্রবাসী বাংলাদেশি এবং নিহতদের স্বজনদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিভে যাওয়া একটি সম্ভাবনাময় পরিবারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের একটাই প্রশ্ন—স্বপ্ন দেখতে গিয়ে কেন এমন করুণ পরিণতি বরণ করতে হলো এই অভিবাসী পরিবারটিকে?

জনপ্রিয়

ইতালিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার নোয়াখালীর একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ দাফন: এলাকায় শোকের ছায়া

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

ইতালিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার নোয়াখালীর একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ দাফন: এলাকায় শোকের ছায়া

আপডেট : ১২:৪৯:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

ভাগ্য বদলের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের কামাল উদ্দিন বাবুল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক বীভৎস ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি তাঁর পরিবার। ইতালির রাজধানী রোমে আততায়ীর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নিহত সেই একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরেছে। আজ শুক্রবার সকালে কফিনে করে কামাল উদ্দিন (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু আক্তার (৩৮) এবং তাঁদের আদরের পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আরোয়া ইসলামের নিথর দেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো তাঁদের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় এদিন কোম্পানীগঞ্জের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিকেলে মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছানোর পর এক নজর দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমান শত শত মানুষ। বাদ মাগরিব স্থানীয় শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তিনজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত কামালের বৃদ্ধ বাবা সিরাজুল ইসলাম যখন বিলাপ করে বলছিলেন, তাঁর ছেলেই কিছুদিন আগে দেশে এসে পারিবারিক কবরস্থান সংস্কার করে গিয়েছিল, তখন সেখানে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে কবরস্থান তিনি নিজ হাতে গুছিয়েছিলেন, আজ সেখানেই স্ত্রী-সন্তানসহ চিরনিদ্রায় শায়িত হতে হলো তাঁকে।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৬ জুন রাতে ইতালির রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা কামাল উদ্দিনের বাসায় ঢুকে তছনছ করে দেয় সুখের সংসার। ঘটনাস্থলেই মারা যান স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের ছোট সন্তান। তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তাঁদের পুত্র অয়ন, যে কিনা বর্তমানে গভীর ট্রমা ও শোক নিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। এ হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ইতালির পুলিশ এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে দফায় দফায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, তা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁদের বাড়িতে ‘লাল বাহিনী’ নামক একটি দুষ্কৃতকারী চক্রের পক্ষ থেকে হুমকি সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠিতে মোটা অঙ্কের টাকা ও স্বর্ণালংকার দাবি করা হয় এবং তা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই হুমকির পর স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিলেন তাঁরা। তবে সেই হুমকির সঙ্গে রোমের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে ইতালীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এবং গোয়েন্দারা সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করছে। প্রবাসী বাংলাদেশি এবং নিহতদের স্বজনদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিভে যাওয়া একটি সম্ভাবনাময় পরিবারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের একটাই প্রশ্ন—স্বপ্ন দেখতে গিয়ে কেন এমন করুণ পরিণতি বরণ করতে হলো এই অভিবাসী পরিবারটিকে?