বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা এবং পরবর্তী বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ বিভিন্ন অজুহাতে স্বৈরাচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ ধর্মের নামে, কেউ ভারতবিরোধিতা, আবার কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার দোহাই দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করেছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বদলে বুদ্ধিজীবীরা যখন ক্ষমতার সখ্য বেছে নেন, তখন তা কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বরং গোটা জাতিকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
ইতালীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি এবং ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েলের বিশ্লেষণে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রামসি তাঁর ‘প্রিজন নোটবুকস’-এ বুদ্ধিজীবীদের সেই ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন, যাকে পরবর্তীতে নোয়াম চমস্কির তত্ত্বে ‘সম্মতি নির্মাণ’ বা ম্যানুফাকচারিং কনসেন্ট হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। স্বৈরাশাসকের হাতে বন্দুক থাকলেও বুদ্ধিজীবীর প্রধান অস্ত্র হলো কলম ও ভাষা। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে হিটলার, স্তালিন কিংবা আইয়ুব খানের মতো শাসকরা বুদ্ধিজীবীদের তৈরি বয়ানের ওপর ভর করেই নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছেন। জনগণের মাঝে বুদ্ধিজীবীদের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ঠান্ডা মাথার গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আদর্শিক চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই চিত্র দেখা গেছে। আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ভোটাধিকার এবং বাক্স্বাধীনতার মতো মৌলিক বিষয়গুলো লঙ্ঘিত হওয়া সত্ত্বেও দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি বড় অংশ নিরবতা পালন করেছেন অথবা সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলে তাঁরা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে অপরিহার্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ও যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে রক্তে ভাসছিল, তখনো শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে অবস্থান নেন, যা বুদ্ধিজীবী সমাজের চরম নৈতিক পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, নিকোলাই বুখারিন বা মার্টিন হাইডেগারের মতো প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীরাও নিজ নিজ মতাদর্শের অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন হয়ে স্বৈরাচারী শাসকদের সমর্থন দিয়ে গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের নির্মম পরিণতি থেকে তারা কেউ রক্ষা পাননি। বুদ্ধিজীবীদের প্রধান দায়িত্ব হলো ক্ষমতার তোষামোদ করা নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অনবরত আঘাত হানা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা ও দলীয় আনুগত্যের মোহে এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা সেই পবিত্র দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, যার খেসারত দিতে হয়েছে সমগ্র জাতিকে।
রিপোর্টার নাম: 























