Hi

০৯:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০৭:১৫:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ১৪ জন দেখেছে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে এবং এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ উভয়ই হারিয়েছে। ভোটাররা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে রায় দিয়েছেন, যা ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতির প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ফলাফল স্পষ্ট করেছে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫ আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছিল ২১৮ আসন। ৭৩ আসনের ফলাফল ঘোষণা বাকি থাকতেই এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ পেরিয়ে গেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনের আগে সিনেটের চিত্র ছিল রিপাবলিকান পার্টি ৫৩ আসন, ডেমোক্রেটিক পার্টি ৪৫ আসন। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন ২০১৭ সালে। তবে এর পরের নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৫ সালে।

প্রথা অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর জনগণের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরান যুদ্ধ, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, কঠোর শুল্কনীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রিপাবলিকান পার্টির পারফরম্যান্স নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। বিভিন্ন জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আভাস ছাপিয়ে ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি আসনের প্রয়োজন হয়। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ২২৫টি আসনে জয়ী হয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে মাত্র ১৩৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল জয় বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়, যা ১৯৯০ সালের ২৬৭ আসনের রেকর্ডের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা ৫৪ এবং রিপাবলিকানদের ৪৪। ভোটের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে গতকাল বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা) প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৫ আসন। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তত ৫১টি আসন পেতে হয়। জনপ্রিয়তায় এই ধসের পেছনের কারণগুলোই মূলত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে।

এই পরাজয় ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন আইনপ্রণেতারা দায়িত্ব নিলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত শুরু করতে পারবেন, যার আওতায় ট্রাম্পের পরিবার ও মিত্ররা আসতে পারেন। একই সঙ্গে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দেওয়া বা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য সহজ হবে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র‍্যাপের মতে, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামী দুই বছর ট্রাম্প বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবেন, যদিও সেনা মোতায়েন বা যুদ্ধ পরিচালনার মতো সামরিক ক্ষমতা তাঁর হাতে রয়ে গেছে। মোটকথা, আইন পাস কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে ট্রাম্প যে ফায়দা লোটার কথা বলেছিলেন, তা-ও বাস্তবে হয়নি। মিসরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাইদকে নিয়ে ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করতে ছাড়েননি।

জনপ্রিয়তার নিরিখেও ট্রাম্প এক কঠিন সময় পার করছেন। রয়টার্স/ইপসস পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা কার্যকরভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের এই কৌশল কাজ করেছে এবং দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের কারণে টেক্সাস ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। সঙ্গে আছে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ। ট্রাম্পের কথামতো এই যুদ্ধ দ্রুত তো শেষই হয়নি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। যেমন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসের সিনেটর প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর প্রার্থী ডারলিন গ্রাহাম।

নির্বাচনে ভোট শেষে পরিচালিত বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ ভোটারই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ ভোটার চান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেস যেন আরও জোরালো নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে লাতিন, সীমান্তবর্তী এবং কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দলের সামগ্রিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। সেই মেয়াদ শেষে নির্বাচনে হেরে যান তিনি।

গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা আধিপত্য ধরে রেখেছেন। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা ২৮টি এবং রিপাবলিকানরা ২০টি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পাঁচজন রিপাবলিকান গভর্নর তাঁদের পদ হারিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু ইতিহাসও সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মিশিগানের আবদুল আল-সাইদ। এছাড়া নিউ মেক্সিকোর ডেব হালান্ড প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর এবং মিনেসোটার পেগি ফ্ল্যানাগান প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। কেইশা ল্যান্স জর্জিয়া থেকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর এবং জিনা হিনোজোসা টেক্সাস থেকে প্রথম লাতিন গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৮ আসন। এবারের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পাশাপাশি ৫০ অঙ্গরাজ্যের ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ধনী বা দরিদ্র, শিক্ষার হার বেশি বা কম-নির্বিশেষে অনেক এলাকাতেই সমর্থন হারিয়েছেন রিপাবলিকানরা। পাঁচ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদ হারিয়েছেন তাঁরা।

বিজয়ের পর ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, ভোটাররা কট্টরপন্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ডেমোক্র্যাটদের নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প নিজের পরাজয় আঁচ করতে পেরে প্রথমে সুর চড়া রাখলেও শেষ পর্যন্ত ফল মেনে নিয়েছেন। সিবিএস নিউজকে তিনি জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানান এবং দেশের কল্যাণে সহযোগিতার বার্তা দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ফলাফল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একে নতুন যুগের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জনগণের রায়কে দারিদ্র্যবিরোধী নীতির সমর্থন হিসেবে দেখছেন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই নির্বাচনী ফলাফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান শত্রুতায় বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের এই উদ্বেগ প্রশমন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের ডিন বেকার আল-জাজিরাকে বলেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এবং বিদ্যমান অস্থিরতা কমাতে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। আগামী দিনগুলোতে নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতারা এই বিষয়গুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করেন, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর অভিযানে ৪৪০ হুথি যোদ্ধা নিহত

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

আপডেট : ০৭:১৫:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে এবং এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ উভয়ই হারিয়েছে। ভোটাররা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে রায় দিয়েছেন, যা ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতির প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ফলাফল স্পষ্ট করেছে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫ আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছিল ২১৮ আসন। ৭৩ আসনের ফলাফল ঘোষণা বাকি থাকতেই এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ পেরিয়ে গেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনের আগে সিনেটের চিত্র ছিল রিপাবলিকান পার্টি ৫৩ আসন, ডেমোক্রেটিক পার্টি ৪৫ আসন। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন ২০১৭ সালে। তবে এর পরের নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৫ সালে।

প্রথা অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর জনগণের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরান যুদ্ধ, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, কঠোর শুল্কনীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রিপাবলিকান পার্টির পারফরম্যান্স নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। বিভিন্ন জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আভাস ছাপিয়ে ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি আসনের প্রয়োজন হয়। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ২২৫টি আসনে জয়ী হয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে মাত্র ১৩৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল জয় বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়, যা ১৯৯০ সালের ২৬৭ আসনের রেকর্ডের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা ৫৪ এবং রিপাবলিকানদের ৪৪। ভোটের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে গতকাল বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা) প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৫ আসন। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তত ৫১টি আসন পেতে হয়। জনপ্রিয়তায় এই ধসের পেছনের কারণগুলোই মূলত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে।

এই পরাজয় ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন আইনপ্রণেতারা দায়িত্ব নিলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত শুরু করতে পারবেন, যার আওতায় ট্রাম্পের পরিবার ও মিত্ররা আসতে পারেন। একই সঙ্গে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দেওয়া বা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য সহজ হবে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র‍্যাপের মতে, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামী দুই বছর ট্রাম্প বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবেন, যদিও সেনা মোতায়েন বা যুদ্ধ পরিচালনার মতো সামরিক ক্ষমতা তাঁর হাতে রয়ে গেছে। মোটকথা, আইন পাস কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে ট্রাম্প যে ফায়দা লোটার কথা বলেছিলেন, তা-ও বাস্তবে হয়নি। মিসরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাইদকে নিয়ে ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করতে ছাড়েননি।

জনপ্রিয়তার নিরিখেও ট্রাম্প এক কঠিন সময় পার করছেন। রয়টার্স/ইপসস পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা কার্যকরভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের এই কৌশল কাজ করেছে এবং দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের কারণে টেক্সাস ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। সঙ্গে আছে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ। ট্রাম্পের কথামতো এই যুদ্ধ দ্রুত তো শেষই হয়নি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। যেমন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসের সিনেটর প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর প্রার্থী ডারলিন গ্রাহাম।

নির্বাচনে ভোট শেষে পরিচালিত বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ ভোটারই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ ভোটার চান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেস যেন আরও জোরালো নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে লাতিন, সীমান্তবর্তী এবং কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দলের সামগ্রিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। সেই মেয়াদ শেষে নির্বাচনে হেরে যান তিনি।

গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা আধিপত্য ধরে রেখেছেন। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা ২৮টি এবং রিপাবলিকানরা ২০টি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পাঁচজন রিপাবলিকান গভর্নর তাঁদের পদ হারিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু ইতিহাসও সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মিশিগানের আবদুল আল-সাইদ। এছাড়া নিউ মেক্সিকোর ডেব হালান্ড প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর এবং মিনেসোটার পেগি ফ্ল্যানাগান প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। কেইশা ল্যান্স জর্জিয়া থেকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর এবং জিনা হিনোজোসা টেক্সাস থেকে প্রথম লাতিন গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৮ আসন। এবারের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পাশাপাশি ৫০ অঙ্গরাজ্যের ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ধনী বা দরিদ্র, শিক্ষার হার বেশি বা কম-নির্বিশেষে অনেক এলাকাতেই সমর্থন হারিয়েছেন রিপাবলিকানরা। পাঁচ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদ হারিয়েছেন তাঁরা।

বিজয়ের পর ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, ভোটাররা কট্টরপন্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ডেমোক্র্যাটদের নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প নিজের পরাজয় আঁচ করতে পেরে প্রথমে সুর চড়া রাখলেও শেষ পর্যন্ত ফল মেনে নিয়েছেন। সিবিএস নিউজকে তিনি জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানান এবং দেশের কল্যাণে সহযোগিতার বার্তা দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ফলাফল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একে নতুন যুগের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জনগণের রায়কে দারিদ্র্যবিরোধী নীতির সমর্থন হিসেবে দেখছেন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই নির্বাচনী ফলাফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান শত্রুতায় বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের এই উদ্বেগ প্রশমন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের ডিন বেকার আল-জাজিরাকে বলেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এবং বিদ্যমান অস্থিরতা কমাতে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। আগামী দিনগুলোতে নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতারা এই বিষয়গুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করেন, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।