যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস রচনা করলেন সাবা হায়দার।
ভারতের উত্তর প্রদেশের সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা এই নারী ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। এই জয়ের মাধ্যমে তিনি ইলিনয়ের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন। গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্তত ৩০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, যাদের মধ্যে সাবা অন্যতম। সেখান থেকে ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছেন সামাজিক কর্মকাণ্ডে, এরপর স্থানীয় রাজনীতি। নতুন দেশে নতুন পরিবেশে জীবন শুরু করলেও নিজের পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন একটি পেশায় যুক্ত হন সাবা। প্রথম নির্বাচনে হার, তারপর ঘুরে দাঁড়ানো।
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী সাবা হায়দার মোট ২০ হাজার ৭৫৬ ভোট পেয়েছেন, যা প্রদত্ত ভোটের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রায়ান স্কোপা পেয়েছেন ৮ হাজার ৫২০ ভোট। তার এই নির্বাচনী এলাকাটি উইল, ডুপেজ, কেইন ও কেন্ডাল কাউন্টির কিছু অংশ নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে অরোরা, ন্যাপারভিল ও অসওয়েগোর মতো জনপদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ৪২ বছর বয়সি সাবা হায়দার ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন ডেমোক্রেটিক রাজনীতিক। এবার তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান দলের বর্তমান সদস্য প্যাটি গুস্টিন। অন্যদিকে প্যাটি গুস্টিন পেয়েছিলেন ৩১ হাজার ৩৯৫ ভোট।
সাবার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভারতেই। তার বাবা সৈয়দ আলী হায়দার একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এবং মা চাঁদনি। পৈতৃক বাড়ি গাজিয়াবাদে হলেও তার শিকড় বুলন্দশহর জেলার আওরঙ্গাবাদ শহরে। গাজিয়াবাদের হলি চাইল্ড স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষে তিনি রাম চামেলি চাড্ডা বিশ্বাস গার্লস কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে (এএমইউ)। ২০০৬ সালে বিয়ে করেন বুলন্দশহরের কম্পিউটারবিজ্ঞান প্রকৌশলী আলী কাজমিকে।
২০০৭ সালে বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
শিকাগো এলাকায় বসতি গড়ার পর বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী থেকে তিনি নিজেকে একজন সার্টিফায়েড যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলেন।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি কমিউনিটির নানা সমস্যা ও উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। তবে প্রথমবারের পরাজয় তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
তার মা চাঁদনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বিতর্ক ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভ্যাস থাকায় সাবার মধ্যে জনস্বার্থে কথা বলার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
তার রাজনৈতিক যাত্রা অবশ্য শুরু থেকেই সহজ ছিল না। ২০২২ সালের নভেম্বরে ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের নির্বাচনে তিনি প্রথম অংশ নেন, কিন্তু সেবার প্রায় এক হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তবে দমে না গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে দেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে তিনি প্যাটি গুস্টিনকে পরাজিত করে ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তিনি ৪০ হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। একবার নির্বাচনে হেরে গেলেও দমে যাননি। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে তিনি ৮ হাজার ৫২১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
কাউন্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সাবা পরিবেশ ও কৌশলগত পরিকল্পনাসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বোর্ড এবং ইন্ডিয়ান প্রেইরি এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। স্থানীয় শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতে তার এই সম্পৃক্ততা নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সাবা জানান, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে জয় লাভের আগে তার প্রচার দল টানা ১৫ মাস ধরে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নই ছিল তার নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কর্মজীবী পরিবারের উদ্বেগের কথা তিনি স্প্রিংফিল্ডে ইলিনয়ের আইনসভায় তুলে ধরতে চান। মেয়ের নির্বাচনী জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। তার মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবারের বাড়তি খরচের চাপে কর্মজীবী মানুষ ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সাজানো হয়েছে। নিজের নির্বাচনী প্রচারে সাবা বলেছিলেন, ‘কর্মজীবী পরিবারগুলো কী ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি।
মেয়ের এই সাফল্যে সাবার বাবা সৈয়দ আলী হায়দার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এটি কেবল তাদের পরিবারের জন্য নয়, বরং ভারতের জন্যও অত্যন্ত গর্বের একটি মুহূর্ত। সাবার স্বামী আলী কাজমি এবং দুই সন্তান আজিম ও আইজাও তার এই রাজনৈতিক পথচলায় বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতির ধাপ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার সদস্য হওয়া সাবার এই উত্থানকে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুরুতে জীবন গড়েছেন শিকাগোতে, কাজ করেছেন যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক হিসেবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক তার জীবনের গল্প। তাদের দুই সন্তান রয়েছে—১৬ বছর বয়সি আজিম এবং ১২ বছর বয়সি আইজা। পরে কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও করপোরেট পেশাজীবীদের যোগব্যায়াম শেখাতে শুরু করেন। গাজিয়াবাদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তার উঠে আসার গল্পও গুরুত্ব পায় ওই প্রতিবেদনে। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করা, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তার লক্ষ্য ছিল আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি গড়ে তোলা।
রিপোর্টার নাম: 























