ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান শ্রমিকদের একটানা বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিনের অস্থিরতায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানা, যানবাহন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটায় পোশাক খাতের আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্র ও মালিকপক্ষ জানিয়েছে। যদিও প্রকৃত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে গাজীপুরের এই হিসাব এবং আগের দুইদিনের রপ্তানি বিঘ্নের হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে। বছরের মোট রপ্তানি আদেশের একটি বড় অংশের ক্রয়াদেশ এ সময়েই আসে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, ১লা নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া এলাকার ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার বা ৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। পরদিন ২রা নভেম্বর এই সংখ্যা বেড়ে ৬৯০টি কারখানায় দাঁড়ায়, যার ফলে আরও প্রায় ৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি ব্যাহত হয়। এই দুই দিনে কাজে যোগ দিতে পারেননি প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক। সবমিলিয়ে প্রথম দুই দিনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর ৩রা নভেম্বর ১৫০টি, ৪ঠা নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ই নভেম্বর আরও ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকে, যা থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়ে রপ্তানিকারকরা প্রায় ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সবমিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ। অন্যদিকে শুধু গাজীপুরেই গত ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইও জানিয়েছে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষে পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প খাতের কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলমান এই অস্থিরতার কারণে স্থানীয় কারখানা ও গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জননিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ায় মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা দফায় দফায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, অনেক কারখানায় শ্রমিকরা কাজে এসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় উৎপাদন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হলেও সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। বিজিএমইএ’র হিসাবে প্রায় ২০-২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানের দু’টি কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ডলার করে লোকসান গুণতে হচ্ছে। ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট এই কারখানা দু’টি চালু থাকুক বা বন্ধ, নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয় ঠিকই বহন করতে হয়। উৎপাদন সূচি ও সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে জরিমানা, আকাশপথে জরুরি পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি অথবা ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর মতো গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক চলমান এই পরিস্থিতিকে পোশাক খাতের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, রপ্তানির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তা সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমানে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়টি আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রতিটি দিন মালিকপক্ষকে বিশাল আর্থিক চাপের মুখে ফেলছে। সব মিলিয়ে কারখানা ও যানবাহনের ক্ষতি, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি বিবেচনায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিক হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপোর্টার নাম: 
























