ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে বড় ধরনের অস্পষ্টতা ও স্ববিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনি দেশটিতে হামলার হুমকি দিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে আলোচনার অগ্রগতির দাবি করছেন। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর থেকেই ট্রাম্পের এমন অস্থির অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের চাপে থাকা ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি এমন কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবেন কি না, তা শিগগিরই পরিষ্কার হবে বলেও মন্তব্য করেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি আবারও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের যেসব দাবি রয়েছে, তা থেকে তেহরান সরে আসতে রাজি নয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি শুক্রবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্যের বিনিময়ে সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীও রয়েছেন।
তবে একই দিনে তিনি সুর বদলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির কথা বলেন। ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের সঙ্গে অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং তারা চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। যদিও এ বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া সেই গুঞ্জন নাকচ করে দেন, যেখানে বলা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি একে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাওয়া গোষ্ঠীর অপপ্রচার হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো—এখন সেটিই তার বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রচারণা শুধু তাদেরই উপকারে আসে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়।
সামরিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে শুক্রবার ইরানের কেশব দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দ্বীপটির সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কেশব দ্বীপ ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন একে আত্মরক্ষামূলক হামলা বলে দাবি করেছিল। এই ঘটনার পাল্টা হিসেবে ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম জানিয়েছে, সেখানকার পরিস্থিতি বর্তমানে তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ভূগর্ভস্থ স্থাপনাও রয়েছে, যেগুলোকে ‘মিসাইল সিটি’ বলা হয়। সোমবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, মার্কিন সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে ইরান যাতে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য এসব হামলা চালানো হয়েছে। পাহাড়টির নিচে বিশাল সুড়ঙ্গ ও বিভিন্ন স্থাপনার একটি জটিল নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ফের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তেহরান ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থাপনাগুলোর আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ শুরু হয়েছে।
পারমাণবিক বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বুশেহর শহরের বাসিন্দাদের মধ্যেও এই ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে, যেখানে ইরানের একমাত্র সচল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি অবস্থিত। একই সঙ্গে ইরানকে নিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যেও মতবিভক্তি তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনায় হামলার আশঙ্কাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ইরান।
কৌশলগতভাবে ইরান এখন সাতটি দাবি মেনে নেওয়ার শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে হামলার নিশ্চয়তা। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে। সাবেক ইরানি কূটনীতিক হাদি আফগাহি আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় হলে তেহরান সমঝোতার পথ সহজ করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প এখনো যুদ্ধের পক্ষে থাকা কট্টরপন্থীদের বলয়ের মধ্যেই রয়েছেন। তথ্যদাতাদের প্রয়োজনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ অনিশ্চয়তাই তাঁর ব্যক্তিগত দ্বিধা বাড়াচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও সমঝোতার বিষয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য কোনো পক্ষকেই নিখুঁত মুহূর্তের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়। বর্তমানে ট্রাম্প একটি জটিল দ্বিধার মুখে রয়েছেন; হয় তাঁকে কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে শর্ত মেনে সমঝোতা করতে হবে, অথবা নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিতে হবে। যুদ্ধ নিয়ে নিজ দলের ভেতরেও বিরোধিতার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ানের মতে, ইরান ইতিমধ্যে তাদের পাল্টা হামলার পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আহমাদিয়ানের ভাষ্যমতে, সীমিত পরিসরে হামলা চালালে ট্রাম্প নিশ্চিত হতে পারছেন না যে এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। ইরান তাদের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের মাধ্যমে ট্রাম্পকে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রেখেছে। ট্রাম্প এসব হামলাকে ‘ছোটখাটো হামলা’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য সেন্টকমকে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, নতুন কোনো আগ্রাসন হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা যেকোনো দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান। দুই দেশই এখন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা জানালেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যহত রয়েছে। এই দুই পরিস্থিতি তাকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি চললেও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই।
রিপোর্টার নাম: 






















