Hi

০৫:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাজেকে টানা সাত দিনের অবরোধে স্থবির জনজীবন, বিপাকে স্থানীয়রা

রাঙামাটির সাজেকে চলছে টানা সাত দিনের লাগাতার অবরোধ। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ফলে সাজেক সড়কে বুধবার সকাল পর্যন্ত কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জুমচাষিরা। সুনসান সাজেক, চতুর্থ দিনে গড়াল অবরোধ। ১০ নম্বর হাজাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সমর্থনে আজ বুধবার পিকেটাররা অবস্থান করছেন। টাকার অভাবে প্রবারণা পূর্ণিমাও ভালোভাবে উদ্‌যাপন করতে পারেননি। সাজেকে অবরোধ: মূল সমস্যা যেভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে। গত বুধবার দুটি সংগঠন এক বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবন্দি হয়ে দিন পার করছেন এবং মজুত থাকা খাবার শেষ পর্যায়ে। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি দোকানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অপরিবর্তিত থাকলে এলাকায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন তিনি। বছরের এই কয়েক মাসই তাঁদের আয় করার সময়। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিন পর না খেয়ে থাকতে হবে।

স্থানীয় জৌপেইথাং ত্রিপুরা, যিনি ১৬৯ নম্বর শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য, তিনি জানান যে ২২টি পাড়ার অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অবরোধের কারণে মাচলং বাজারে কৃষিপণ্য নিতে না পারায় কলা, পেঁপে, আখ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া ও কচুর মতো ফসল নষ্ট হচ্ছে। একইসঙ্গে বাজারে প্রয়োজনীয় ওষুধ, নাপ্পি ও শুঁটকির মতো সামগ্রীর অভাব দেখা দিয়েছে। আট সদস্যের সংসারে অসুস্থ বাবা ও দাদির পাশাপাশি দুই ছোট ভাইয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর।

পরিবহন খাতে কর্মরতদের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। পর্যটন মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় চালক ও সহকারীরা আয় হারিয়ে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। পিকআপ চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, আগে প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে ভালো আয় করতেন, কিন্তু এখন পাঁচ হাজার টাকা ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে। একইভাবে পিকআপ সহকারী মো. শাকিল খন্দকার এবং চাঁদের গাড়ি চালক অংগোজাই মগও পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার তবলছড়ির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন দৈনিক মজুরিতে পিকআপ ভ্যান চালান। এ সময়ে প্রতিদিন গাড়ি চালানোর লাইন থাকত। পিকআপের সহকারী মো. শাকিল খন্দকার বলেন, সাজেকে গাড়ি গেলে প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরি পান তিনি। অবরোধে এসব যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।

যানবাহন মালিকদের অবস্থাও একই। মো. মুন্না নামের এক মালিক আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কেনা পিকআপের মাসিক ৩২ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানান, সাজেকে চলাচলকারী অন্তত দেড় হাজার যানবাহন বর্তমানে অচল। এতে জেলায় দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতি মাসে তাঁকে ঋণের ৩২ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। সামনে কঠিন চীবর দান, কী করবেন বুঝতে পারছেন না। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনায় তাঁরাও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের তিন দফা দাবিতে আয়োজিত এই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ সংগঠনগুলোর তৃতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি।

এর আগে ১১ অক্টোবর এক দিনের এবং ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় অবরোধ ডাকা হয়েছিল, তবে শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। সংগঠনটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার পর পর্যটকেরা এলাকা ছেড়েছেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযোগ, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছে, যদিও ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে ফিরেছেন পর্যটকেরা, হোটেল না পেয়ে ভোগান্তি।

অবরোধের সমর্থনে ও সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে গত শনিবার ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ পালন করে। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, অবরোধ চলমান থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশে পাঁচ খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সাজেকে টানা সাত দিনের অবরোধে স্থবির জনজীবন, বিপাকে স্থানীয়রা

আপডেট : ০৩:৪৬:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

রাঙামাটির সাজেকে চলছে টানা সাত দিনের লাগাতার অবরোধ। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ফলে সাজেক সড়কে বুধবার সকাল পর্যন্ত কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জুমচাষিরা। সুনসান সাজেক, চতুর্থ দিনে গড়াল অবরোধ। ১০ নম্বর হাজাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সমর্থনে আজ বুধবার পিকেটাররা অবস্থান করছেন। টাকার অভাবে প্রবারণা পূর্ণিমাও ভালোভাবে উদ্‌যাপন করতে পারেননি। সাজেকে অবরোধ: মূল সমস্যা যেভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে। গত বুধবার দুটি সংগঠন এক বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবন্দি হয়ে দিন পার করছেন এবং মজুত থাকা খাবার শেষ পর্যায়ে। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি দোকানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অপরিবর্তিত থাকলে এলাকায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন তিনি। বছরের এই কয়েক মাসই তাঁদের আয় করার সময়। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিন পর না খেয়ে থাকতে হবে।

স্থানীয় জৌপেইথাং ত্রিপুরা, যিনি ১৬৯ নম্বর শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য, তিনি জানান যে ২২টি পাড়ার অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অবরোধের কারণে মাচলং বাজারে কৃষিপণ্য নিতে না পারায় কলা, পেঁপে, আখ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া ও কচুর মতো ফসল নষ্ট হচ্ছে। একইসঙ্গে বাজারে প্রয়োজনীয় ওষুধ, নাপ্পি ও শুঁটকির মতো সামগ্রীর অভাব দেখা দিয়েছে। আট সদস্যের সংসারে অসুস্থ বাবা ও দাদির পাশাপাশি দুই ছোট ভাইয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর।

পরিবহন খাতে কর্মরতদের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। পর্যটন মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় চালক ও সহকারীরা আয় হারিয়ে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। পিকআপ চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, আগে প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে ভালো আয় করতেন, কিন্তু এখন পাঁচ হাজার টাকা ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে। একইভাবে পিকআপ সহকারী মো. শাকিল খন্দকার এবং চাঁদের গাড়ি চালক অংগোজাই মগও পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার তবলছড়ির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন দৈনিক মজুরিতে পিকআপ ভ্যান চালান। এ সময়ে প্রতিদিন গাড়ি চালানোর লাইন থাকত। পিকআপের সহকারী মো. শাকিল খন্দকার বলেন, সাজেকে গাড়ি গেলে প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরি পান তিনি। অবরোধে এসব যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।

যানবাহন মালিকদের অবস্থাও একই। মো. মুন্না নামের এক মালিক আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কেনা পিকআপের মাসিক ৩২ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানান, সাজেকে চলাচলকারী অন্তত দেড় হাজার যানবাহন বর্তমানে অচল। এতে জেলায় দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতি মাসে তাঁকে ঋণের ৩২ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। সামনে কঠিন চীবর দান, কী করবেন বুঝতে পারছেন না। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনায় তাঁরাও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের তিন দফা দাবিতে আয়োজিত এই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ সংগঠনগুলোর তৃতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি।

এর আগে ১১ অক্টোবর এক দিনের এবং ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় অবরোধ ডাকা হয়েছিল, তবে শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। সংগঠনটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার পর পর্যটকেরা এলাকা ছেড়েছেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযোগ, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছে, যদিও ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে ফিরেছেন পর্যটকেরা, হোটেল না পেয়ে ভোগান্তি।

অবরোধের সমর্থনে ও সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে গত শনিবার ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ পালন করে। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, অবরোধ চলমান থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।