বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান দলীয়করণের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক সহিংসতার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়া নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দেব। তাদের তথ্যে ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার রজনীগন্ধা মিলনায়তনে পাঁচ জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার প্রাক্কালে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং প্রস্তাবনার মাধ্যমেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরবর্তী রূপরেখা নির্ধারিত হবে। বিগত কয়েক দিনে সরকার দলীয় অন্তঃকোন্দলের জেরে অসংখ্য মানুষের হতাহতের ঘটনাকে তিনি উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই কয়েক দিনে সরকারদলীয় অন্তঃকোন্দলে কয়েকশ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতন ঘটলেও এর দোসররা এখনো বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা জীবন ও রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করেছে। এখন এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বৈরাচার ও নতুন কোনো দুর্নীতিবাজ চক্রের সংমিশ্রণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এদিকে, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাংবাদিকদের নিয়ে করা আপত্তিকর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, দায় চাপানোর পরিবর্তে পুলিশের উচিত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের অধিকার ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ একদিকে, স্বৈরাচার একদিকে, আরেক দিকে নতুন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ শক্তি—এরা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। নিজেদের দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর পরিবর্তে পুলিশের দায়িত্ব হলো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা।
মাদক সিন্ডিকেট ও এর নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষক নিয়ে নাহিদ ইসলামের দাবি, অতীতে আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বিএনপি বিভিন্নভাবে মাদক বাণিজ্যে মদদ দিচ্ছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোও সরকার আমলে নিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচক সাংবাদিকদের গণমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। ফলে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে এবং সত্য তুলে ধরতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, বাজেট অধিবেশনে অর্থনৈতিক সংস্কারের কোনো কার্যকর রূপরেখা আসেনি। ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা ফিরছে না। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যেই ঋণখেলাপিদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় আরও ঘনীভূত করছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে এই খাত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে অংশ নেবে বলে নাহিদ ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। ১১ দলীয় জোট কেবল জাতীয় নির্বাচন ও সংসদে বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার জন্য গঠিত হলেও, এনসিপির নিজস্ব আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পৃথক। জাতীয় স্বার্থে সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে জোটগত কর্মসূচি চলমান থাকলেও, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করতে স্থানীয় নির্বাচনে তারা আলাদাভাবে লড়াই করবেন।
উল্লেখ্য যে, প্রেস ব্রিফিং ও মতবিনিময় সভায় এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান অপু এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিলসহ পাঁচ জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার নাম: 























